ইয়েমেনের সামরিক ঘাঁটিতে হাউছিদের হামলা, ৫৮ সেনা নিহত

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ৫৮ জন সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবারের (৬ আগস্ট) এ হামলা দেশটির চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরান-সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীরা
ইরান-সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীরা |সংগৃহীত

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কমপক্ষে ৫৮ জন সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবারের (৬ আগস্ট) এ হামলা দেশটির চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি বলে জানিয়েছে একটি সামরিক সূত্র।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে হাউছিরা একদিকে ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান সমর্থক সৌদি আরবের ওপরও হামলা বাড়িয়েছে।

হাউছিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি বলেন, সৌদি আরবের সমর্থনে সরকারি বাহিনী সামরিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগের জবাবে বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সরকারি অবস্থানগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক সূত্র জানায়, এসব হামলায় কমপক্ষে ৫৮ জন সরকারি সেনা নিহত এবং আরো কয়েক ডজন আহত হয়েছেন। এর আগে চিকিৎসা সূত্রগুলো ৩৮ জন নিহতের তথ্য দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের জেরে ইয়েমেন এখন নতুন একটি সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, বৃহস্পতিবার সেনা শিবিরে চালানো এ হামলা ২০২২ সালের পর ইয়েমেনে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী ‘যথা সময়ে’ এসব হামলার জবাব দেবে।

এদিকে সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবেও পৌঁছেছে। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার হাউছিদের হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান অঞ্চলে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি জানান, আহতদের মধ্যে সাতজন সৌদি নাগরিক, একজন ইয়েমেনি, দু’জন মিসরীয় এবং একজন পাকিস্তানি রয়েছেন। সৌদি প্রেস অ্যাজেন্সি এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে হাউছিদের বিরুদ্ধে একটি সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

আল-মালকি হাউছিদের বিরুদ্ধে বেসামরিক স্থাপনায় নির্বিচারে গোলাবর্ষণের অভিযোগ এনে বলেন, বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষায় জোট বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।

গত মাস থেকে হাউছিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরো জোরদার করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলের মারিব প্রদেশের আল-রুওয়াইক এলাকায় একটি সেনা শিবিরে হামলা চালানো হয়। এছাড়া সৌদি সীমান্তসংলগ্ন হাদরামাউতের আল-আবর ও আল-ওয়াদিয়াহ এলাকার সেনা শিবিরও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

একটি ক্ষেপণাস্ত্র মারিবের শিবিরে সকালের কুচকাওয়াজ চলাকালে আঘাত হানে। এতে কমপক্ষে ৪৫ জন সেনা নিহত ও আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

হাউছি মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জানান, আল-রুওয়াইক, আল-থানিয়াহ ও আল-আবর এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের উত্তেজনা মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত।

এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ২০২২ সালে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেও গত মাসে ইরান-সমর্থিত হাউছিরা সেই সমঝোতা ভেঙে দিলে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়।

বিদ্রোহীরা রাজধানী সানায় সরাসরি একটি ইরানি বিমানকে স্বাগত জানায়। এর পরপরই উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। পরে হাউছিরা সৌদি আরবের সমুদ্রবন্দর অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং দেশটির তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।

গত মাসে লোহিত সাগর তীরবর্তী হোদেইদাহ বন্দরের দক্ষিণে সরকারপন্থী বাহিনীর ওপর হাউছিদের হামলায় ১৬ জন সেনা নিহত হন বলে দু’টি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছিল।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেন সরকারের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে হাউছি বিদ্রোহীরা। এই সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেশটিতে একটি বড় ধরনের মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে হাউছিরা রাজধানী সানা এবং উত্তর ইয়েমেনের বেশিভাগ জনবহুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

২০২২ সালে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে লড়াই অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তা কার্যত বজায় ছিল।

সূত্র: বাসস