যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা রোববার (৫ জুলাই) জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছেন। একইসাথে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ‘সুপার টাইফুন’ মার্কিন এই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে তাণ্ডব চালাবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আরো বলা হয়, সোমবার ভোর থেকে সুপার টাইফুন বাভি ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিমমুখে অগ্রসর হবে। এটি ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমতুল্য শক্তিশালী। দমকা বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) টাইফুনটিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে সতর্ক করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, রোববার বিকেল বা সন্ধ্যা থেকেই ক্রান্তীয় ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হতে পারে। টাইফুন কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় ‘ভয়াবহ’ ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনডব্লিউএস জানিয়েছে, প্রবল বৃষ্টিতে ব্যাপক বন্যা এবং উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সর্বোচ্চ ৩৫ ফুট (১০ দশমিক ৭ মিটার) উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে, যা প্রায় ১০ তলা ভবনের সমান। এতে সাগরে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
গুয়ামে একটি খাবারের দোকানের মালিক ৫৫ বছর বয়সী পিঙ্কি কুবাকুব। তিনি জানান, দোকানের জানালা সুরক্ষিত রাখতে প্লাইউড দিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছেন। এজন্য শনিবার খুব সকালে কাঠের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ৫০০ ডলারের প্লাইউড কিনেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন ব্যবসা বন্ধ রাখার সামর্থ্য রাখি না। এতে ক্ষতি হবে। আমি নতুন ব্যবসা শুরু করেছি। এখন যা আয় হচ্ছে, তা শুধু ভাড়া, ইউটিলিটি বিল, কর্মীদের বেতন এবং সরঞ্জাম কেনার জন্যই ব্যয় হচ্ছে। এখনো নিজের জন্য কিছুই রাখতে পারিনি।’
কল সেন্টারের কর্মী ৪৮ বছর বয়সী আরাবেলা পলিনো বলেন, ‘আমার মেয়েরা বলছিল, তারা ভয় পাচ্ছে। তবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাড়ি কংক্রিটের। তাই সবচেয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলতে জানালার কাচ ভেঙে যেতে পারে।’
স্কুলবাসচালক ৫১ বছর বয়সী ডার্মা সোয়ালাদাওব জানান, তিনি একটি হোটেলে গিয়ে উঠবেন।
তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি কংক্রিটের হলেও ঝড়ের শব্দ আর বাতাস খুব ভয়ঙ্কর।’
২৫ বছর বয়সী জাপানি পর্যটক মিকু সাকুরাই রোববার বন্ধুদের সাথে টোকিও ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘ঝড় এলে আমরা হোটেলেই থাকব। আমি খুব ভয় পাচ্ছি।’
নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। কাছের গুয়ামও যুক্তরাষ্ট্রের একটি পৃথক অঞ্চল। তবে দু’টি অঞ্চলই মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের অংশ। গুয়ামে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ বাস করেন।
গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সুপার টাইফুন সিনলাকু এই অঞ্চলে আঘাত হানে। এতে কয়েক হাজার মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। উপড়ে যায় অসংখ্য গাছ। উল্টে যায় গাড়ি। অনেক ভবনের টিনের ছাদ উড়ে যায়।
এ সময় এমভি মারিয়ানা নামের একটি মালবাহী জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সেটি উল্টে যায়। তখন একজন নাবিকের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং আরো পাঁচজন নিখোঁজ হন। তাদের মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার সকাল পর্যন্ত পাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়, বাভি সবচেয়ে কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে রোটা দ্বীপের পাশ দিয়ে। এটি গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানার প্রধান দ্বীপ সাইপানের মাঝামাঝি অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ। সেখানে প্রায় এক হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস।
রোটার মেয়র অউব্রি হোকোগ বলেন, ‘আমরা সবাই একসাথে কাজ করে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে আমাদের পরিবার, প্রতিবেশী ও পুরো সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখতে পারব। আমরা আমাদের মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট অ্যাজেন্সির (ফেমা) দল ইতোমধ্যে গুয়ামে অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটির বিতরণকেন্দ্রে ১১ লাখ লিটার পানি, ১২ লাখ খাবার প্যাকেট, ছয় হাজার ৭০০টি খাট এবং ৯০টি জেনারেটর মজুত রাখা হয়েছে।
এনডব্লিউএস জানিয়েছে, নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া বা আশ্রয় নেয়ার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এ কারণে গুয়ামে পাঁচটি স্কুলে মোট এক হাজার ৯০০ জন ধারণক্ষমতার পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে বসবাসকারীদের জন্য এসব কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিস বুধবার জানিয়েছে, বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে এ বছর জুন মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সামনের মাসগুলোতে নতুন রেকর্ডও হতে পারে।
উষ্ণ সমুদ্রের পানি ক্রান্তীয় ঝড়কে আরো শক্তিশালী করে। একইসাথে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ায়। পরে সেই আর্দ্রতা ভারী বৃষ্টির আকারে ঝরে পড়ে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) শুক্রবার সতর্ক করে জানিয়েছে, সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয়া এবং নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হওয়া এল নিনো ইতোমধ্যে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হয়েছে। এটি শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।
প্রাকৃতিক এ জলবায়ুগত ঘটনাটির কারণে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাতাসের প্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে।
সূত্র: বাসস



