ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং দেশটিকে 'শাস্তি' দেয়ার জন্য 'ক্রাউডসোর্সিং' কৌশলের বা দলগত মতামতভিত্তিক কৌশল অন্বেষণ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই পদ্ধতিতে মার্কিন বাহিনী নতুন, সৃজনশীল ও প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে রণকৌশলের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
সামরিক পরিভাষায় 'ক্রাউডসোর্সিং' বলতে বোঝায় কোনো জটিল সমস্যার সমাধান বা নতুন পথ খুঁজতে একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটি বড় সামরিক বিশ্লেষক দল বা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সকলের কাছ থেকে উন্মুক্তভাবে ধারণা ও বুদ্ধি আহ্বান করা।
সিএনএন সোমবার (৩ আগস্ট) উল্লেখ করেছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত বুধবার সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে পাঠানো ইমেইল বার্তায় এমন কৌশল খোঁজার আহ্বান জানান। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স জানান, সর্বোচ্চ সামরিক সাফল্য নিশ্চিত করতে এডমিরাল কুপার তাঁর টিমের সবার কাছ থেকেই নতুন ধারণা ও কৌশল আহ্বান করেন।
সপ্তাহের শেষে আঞ্চলিক নেতাদের, বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে ফোনে আলোচনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নতুন হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেন। এর ঠিক আগেই ওই ইমেইল বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালী এলাকায় জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র টানা বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। তবে তাতে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো চুক্তির লক্ষণ দেখা যায়নি।
গত গ্রীষ্মের হামলায় ' ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে' বলে ট্রাম্প প্রশাসন যে দাবি করেছিল, বাস্তবে তা যে পুরোপুরি সত্যি নয়। তার প্রমাণ মিলছে এখন। উপগ্রহ চিত্র ও আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেই বোমাবর্ষণের পর ইরান থমকে যায়নি। বরং তারা আবার নতুন করে তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে কার্যক্রম শুরু করেছে। আর তাই এবার সেন্টকম তাদের পুরোনো লক্ষ্যবস্তুগুলোর পাশাপাশি নাতানজের কাছে জাগ্রোস পর্বতমালার গভীরে তৈরি 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'-এর মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবারও নতুন করে হামলা চালানোর জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে, সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ বা শক্তিশালী বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলে এসব ভূগর্ভস্থ পরমাণু কেন্দ্র নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব। মাটি বা পাথরের ৩০০ থেকে ৪৫০ ফুট গভীরে থাকা এসব কেন্দ্র ধ্বংস করতে হলে মার্কিন স্থলসেনা পাঠাতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ। তাই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি জেনেও বিশ্বমঞ্চে এক ধরনের প্রতীকী সাফল্য দেখাতে এবং এই যুদ্ধ থেকে কোনোমতে বের হয়ে আসার পথ তৈরি করতে সামরিক বাহিনী কেবল 'আতশবাজি'র মতো কিছু প্রদর্শনমূলক হামলার বিকল্পও ভেবে রাখছে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা ও সিআইএ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিরাজমান বিমান হামলা ইরানের অবস্থান বদলাতে পারছে না। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন মার্কিন সংসদে বলেছেন, 'কেবল বিমান হামলার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।'
সেন্টকম এক বা দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করলেও, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকিতে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া স্থলসেনা পাঠালে নির্বাচনে ট্রাম্পের দেয়া 'বিদেশি যুদ্ধ এড়ানোর' প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।



