পশ্চিম কানাডায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলের কারণে হাজার হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর থেকে বাল্ড রেঞ্জ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এর আকার দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার দাবানল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনটি এখন সামারল্যান্ড, পিচল্যান্ডসহ আশপাশের এলাকায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামারল্যান্ডের মেয়র ডগ হোমস রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমাদের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
আগুনের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে সামারল্যান্ডের পুরো এলাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন কমিউনিটির হাজার হাজার মানুষকেও সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দাবানলের শিখা এত উঁচুতে উঠছিল যে এর ফলে ওই এলাকায় বজ্রপাতও সৃষ্টি হচ্ছিল, যা আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছিল।
সামারল্যান্ডের বাসিন্দা কিগান রাডমস্কি জানান, আগুন তার বাড়িতে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তিনি বাড়ি ছাড়তে সক্ষম হন।
তার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, যে রাস্তা দিয়ে রাডমস্কি পালিয়ে যান, তার ওপারের পাহাড়ের ঠিক পেছনে গাছের মাথায় আগুন জ্বলছে।
ভিডিওতে কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের বাড়ির একেবারে পাশেই।’
রাডমস্কি জানান, শুক্রবার আরো সাতজনের সাথে বাড়ি ছাড়ার পর থেকে তিনি আর সেখানে ফিরতে পারেননি। এখন তারা উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন- ফিরে যাওয়ার মতো তাদের বাড়িটি আদৌ থাকবে কি না।
তিনি বলেন, বাড়িতে থেকে যাওয়া কয়েকজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন, তাদের সড়কের অনেক বাড়ি পুড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘কিছু বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে- এটা নিশ্চিত। আমাদের বাড়ির আশপাশেও অনেক বাড়ি রয়েছে। তাই আমরা খুব ভয় পাচ্ছি। এই অনিশ্চয়তাটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের সতর্কবার্তার মধ্যেই দাবানলটি ভয়াবহ রূপ নেয়। বর্তমানে আগুনটি প্রায় ১৩ হাজার ৬১৮ হেক্টর বা ৩৩ হাজার ৬৫০ একর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, একজন অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা আগুনের তীব্রতাকে ‘একটি বোমা বিস্ফোরণের’ সাথে তুলনা করেছেন।
ইবি বলেন, ‘বাড়িঘর হারিয়ে গেছে এবং সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কিছু মানুষ আটকা পড়েছিলেন এবং তাদের উদ্ধার করতে হয়েছে।’
জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে প্রাদেশিক সরকার অতিরিক্ত কিছু ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ, পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত দাম নেয়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়া।
পাশাপাশি উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কাজে অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
প্রায় ১২ হাজার মানুষের শহর সামারল্যান্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। শহরটির বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষের বসবাস পিচল্যান্ডে। সেখানকার কিছু এলাকার বাসিন্দাদেরও নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়েছে।
পিচল্যান্ডে ৩০ বছর ধরে বসবাস করা আর্ল কার্জ বলেন, ‘আমাদের বহুবার সরিয়ে নেয়ার সতর্কতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম আমাদের সত্যিই বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছে।’
শুক্রবার বিকেলে স্ত্রীকে নিয়ে ওকানাগান লেকে নৌকায় ছিলেন কার্জ। তখন তিনি দেখেন, পরিষ্কার নীল আকাশ খুব দ্রুত ধোঁয়ায় ধূসর হয়ে যাচ্ছে।
রাত নামার সাথে সাথে প্রচণ্ড দাবানলের ওপরে কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ দেখা দেয়। আগুনটি ধীরে ধীরে তার অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছিল।
কার্জ বলেন, ‘আমরা হ্রদ থেকে আগুনটাকে দেখছিলাম। দৃশ্যটা অবাস্তব মনে হচ্ছিল।’
কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তার বাড়িতে এসে তাকে ও তার স্ত্রীকে দ্রুত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
কার্জ জানান, তারা এখন কয়েক মাইল দূরে একটি ক্যাম্পারে নিরাপদে অবস্থান করছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, বাল্ড রেঞ্জের দাবানল এ গ্রীষ্মে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। প্রদেশজুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সামারল্যান্ডের মেয়র ডগ হোমস বলেন, ‘অনেক খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কতগুলো স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, আমরা এখনো জানি না। তারা এখনো আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত।’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা শত শত মানুষ, যার মধ্যে বয়স্কদের আবাসনও রয়েছে, তাদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
তবে আগুনে ঠিক কতগুলো বাড়ি বা স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সেন্ট্রাল ওকানাগান ও ওকানাগান-সিমিলকামিনের আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, স্নপিঙ্ক'টন ইন্ডিয়ান ব্যান্ড এবং সামারল্যান্ড ও পিচল্যান্ড প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করেছে। কিছু এলাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে।
ওকানাগান এলাকায় অনেক ঘোড়া রয়েছে। দাবানলের কারণে সেগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাসিন্দাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে কানাডার সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি জানিয়েছে।
যেসব বাসিন্দা তাদের পশু সরিয়ে নিতে পারেননি, তারা গেট খুলে রেখেছেন- যাতে পশুগুলো নিজেরাই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারে।
কিছু মালিক তাদের পশুদের গায়ে বিশেষ চিহ্নও এঁকে দিয়েছেন, যাতে পরে সেগুলো সহজে শনাক্ত করা যায়।
এ গ্রীষ্মে কানাডাজুড়ে শত শত দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। জুলাই মাসে শুধু অন্টারিওতেই প্রায় ২০০টি দাবানল জ্বলছিল। এসব দাবানলের ধোঁয়ায় কয়েক দিনের জন্য টরন্টোর বায়ুর মান বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছে যায়।
কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন এলাকায়ও পৌঁছেছিল। এর জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
সূত্র : বাসস



