ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৮ দিন পর একজনকে জীবিত উদ্ধার

সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৩০০-তে পৌঁছেছে এবং এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে কুকুর দিয়ে তল্লাশী
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে কুকুর দিয়ে তল্লাশী |সংগৃহীত

ভয়াবহ যুগ্ম ভূমিকম্পের আট দিন পর ভেনিজুয়েলায় ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। এ সময় সেখানে উপস্থিত শত শত উদ্ধারকর্মী উচ্ছ্বাসে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। এএফপির সাংবাদিকরা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন।

ভেনিজুয়েলার কাতিয়া লা মার থেকে এএফপি জানায়, সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৩০০-তে পৌঁছেছে এবং এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তারক্ষী হার্নান গিলকে জীবিত উদ্ধার করাকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কাতিয়া লা মারের প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া উপকূলীয় এলাকায় সাততলা যে ভবনে তিনি কর্মরত ছিলেন, সেখানকার ধ্বংসস্তূপ থেকে দীর্ঘ ও সতর্ক উদ্ধার অভিযানের পর স্ট্রেচারে করে তাকে বের করে আনা হয়।

উদ্ধারের আগে গিলের স্ত্রী গুসবিমার গনসালেস এএফপিকে বলেন, ‘এটি সত্যিই অলৌকিক ঘটনা।’

তিনি বলেন, ‘একজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য এতগুলো দেশকে এভাবে একসাথে কাজ করতে আমি আগে কখনো দেখিনি। আমি সত্যিই বিস্মিত।’

গত তিন দিন ধরে ভেনিজুয়েলা, চিলি, যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল, কোস্টারিকা, এল সালভাদর ও মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দলগুলো দিন-রাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে অভিযান চালিয়ে তার কাছে পৌঁছায়।

অভিযানটি ছিল অত্যন্ত জটিল। কারণ, উদ্ধারকাজের সময় আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো যাতে আরো ধসে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়েছে।

চিলির উদ্ধারকারী দলের প্রধান ক্রিস্তিয়ান ভেরা এএফপিকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী যেখানে ছিলেন, সেখানে পৌঁছানো সহজ ছিল না।’

তবে কয়েকটি বিস্ময়কর উদ্ধার অভিযান—যেমন ভূমিকম্পের ছয় দিন পর মঙ্গলবার তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার—ঘটলেও আরো অনেক জীবিত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

জীবনের কোনো চিহ্ন নেই

রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা শহরের অধিকাংশ ধসে পড়া ভবনে ‘ডি’ চিহ্ন দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভবনগুলো তল্লাশি করে জীবিত কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

স্পেনের উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়ক হাভিয়ের রোদেস বলেন, ‘যেখানে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই, সেখানে সময় নষ্ট করা হয় না।’ তার অনুসন্ধানী কুকুর ‘নালা’ ধ্বংসস্তূপে জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি।

ভেনিজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বুধবার জানান, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ২৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ।

তিনি বলেন, প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

এছাড়া এখনো কয়েক হাজার মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বুধবার সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে বলেন, ‘এত মানুষের প্রাণহানিতে দেশের আত্মা বিদীর্ণ হয়ে গেছে।’

২৪ জুনের ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প তেলসমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলার পুরো পুরো আবাসিক এলাকা ধ্বংস করে দেয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ছয় মাস পর দেশটি এখনো নাজুক রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

টিকে থাকার লড়াই

এখন উদ্ধার হওয়া মানুষের চেয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবন রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মানুষ গৃহহীন এবং খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও বাড়ছে।

বিভিন্ন স্থানে চুরির ঘটনাও ঘটছে। বুধবার স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির সময় চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ত্রাণের জন্য মানুষের সারি দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

৫৬ বছর বয়সী ফাতিমা বেরোতেরান বলেন, ‘গত রাত পর্যন্ত আমরা কোনো সহায়তা পাইনি। এরপর থেকে কিছু পানি আনা শুরু হয়েছে।’ লা গুয়াইরায় বহুতল ভবন ধসে পড়ার পর তিনি পরিবার নিয়ে একটি পার্কিং এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।

ভেনিজুয়েলায় তিন মাস ধরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে মঙ্গলবার ৫ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল চেয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এদিকে, রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বর্তমানে ‘চরম চাপের’ মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের আগে টিকাদানের হার কম থাকায় এখন হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বেড়েছে।

এদিকে নাসার প্রকাশিত স্যাটেলাইট তথ্যের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

সূত্র : এএফপি/বাসস