ইরান যুদ্ধে আমেরিকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার প্রায় ফাঁকা

ক্ষেপণাস্ত্রের এমন আকাল আগে কখনো শোনেনি বিশ্ব। অথচ এই প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম পড়ে ১০ লাখ ডলারের বেশি। চীন বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তির সাথে যদি কখনো সরাসরি লড়াই বাধে, তবে এসব দূরপাল্লার অস্ত্রই হতো আমেরিকার মূল ভরসা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জার্মানির উনটারলুসে অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাইনমেটালের একটি নতুন গোলাবারুদ কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম
জার্মানির উনটারলুসে অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাইনমেটালের একটি নতুন গোলাবারুদ কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম |সংগৃহীত

ইরানের সাথে পাঁচ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিজেদের বেশিরভাগ দূরপাল্লার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাঘাতকারী ক্ষেপণাস্ত্রই খরচ করে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরেই বেশ জল্পনা ও উদ্বেগ শুরু হয়েছে। তাদের ভয়, হঠাৎ নতুন কোনো বড় যুদ্ধ বেধে গেলে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে বিশ্বজুড়ে ছড়ি ঘোরানো মার্কিন বাহিনীকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রয়টার্স জানায়, মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র—বিশেষ করে অ্যাটাকমস এবং নতুন প্রজন্মের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের—এর মজুদ বলতে গেলে প্রায় শেষ করে এনেছে। প্রথম দুটি সূত্রের স্পষ্ট কথা, এসব অস্ত্রের বলতে গেলে 'সবটুকুই' ব্যবহার করে ফেলা হয়েছে।

বিষয়টি আগে একদম গোপনে রাখা হলেও এখন তা হোয়াইট হাউসের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের এমন আকাল আগে কখনো শোনেনি বিশ্ব। অথচ এই প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম পড়ে ১০ লাখ ডলারের বেশি। চীন বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তির সাথে যদি কখনো সরাসরি লড়াই বাধে, তবে এসব দূরপাল্লার অস্ত্রই হতো আমেরিকার মূল ভরসা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের সাথে হাত মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেন। ধারণা করা হয়েছিল, ইরান যুদ্ধ কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধের কোনো কুলকিনারা নেই। উল্টো নিজেদের অস্ত্রের ভাঁড়ার খালি হতে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র তো শেষ হয়েছেই, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা মার্কিনঘাঁটিগুলো থেকেও অস্ত্র এনে ইরান যুদ্ধে ঢালতে হচ্ছে।

ATACMS

অ্যাটাকমস

তবে এই তথ্যের মুখেও মেজাজ হারাচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস থেকে এক বিবৃতিতে ট্রাম্প উল্টো দাবি করেন, 'বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বেশি অস্ত্র আছে, যা আমাদের চাহিদার চেয়েও অনেক বেশি।' তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো এখন দিনরাত এক করে রেকর্ড পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করছে। ট্রাম্পের সুরেই কথা বলেছেন পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শোন পার্নেল। তিনি জানান, মার্কিন বাহিনীর হাতে নিজেদের লোকজনকে রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত ও বিশাল সামরিক শক্তি এখনো মজুদ আছে।

কিন্তু বিশ্লেষক আর নথিপত্র অন্য কথা বলছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সিএসআইএস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ খরচ করে ফেলেছে। পাশাপাশি থাড ব্যালাস্টিক মিসাইল প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুদও কমেছে অন্তত ৩৮ শতাংশ।

শুধু তাই নয়, মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া দূরপাল্লার টমাহক ক্রুজ মিসাইলের বিশ্বব্যাপী মজুদেরও প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে এই পাঁচ মাসের লড়াইয়ে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরানের ভেতরে হামলা চালালে নিজেদের পাইলটদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ত। সেই ঝুঁকি না নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হামলা চালানোর কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। আর সেই পথ বেছে নিতে গিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে নিজেদের শক্তির ভান্ডার শূন্য করে ফেলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ট্রাম্প যেভাবে এই যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও এখন তীব্র তর্কযুদ্ধ চলছে।