বাঙালির বাসনার সেরা বাসা রসনা। আর সেই রসনার রাজপ্রাসাদে বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির চেয়ে বড় সম্রাট আর কেউ নেই।
আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) মতিঝিলের ব্যস্ত ফুটপাত জুড়ে যখন এক দীর্ঘ মানবলাইন চোখে পড়ল, তখন প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল—হয়তো কোনো বড় সংস্থায় চাকরির ইন্টারভিউ চলছে কিংবা বিদেশের ভিসার জন্য কোনো দীর্ঘ প্রতীক্ষা! কিন্তু ভুল ভাঙল মুহূর্তেই। মেঘলা দিনে এক পশলা বৃষ্টির পর বাতাসে যখন ভেজা মাটির ঘ্রাণ আর হিমেল বাতাসের শিরশিরানি, তখন বাঙালির হৃদয়ে রসনার ভাবনা ছাড়া অন্য কোনো জাগতিক আবেদন কাজ করতে চায় না।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে লাইনে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোককে ঘটনা জিজ্ঞেস করতেই তিনি মোবাইলের আলাপের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত অথচ অমোঘ এক উত্তর দিলেন— ‘খিচুড়ি’! মতিঝিলের ওই অতি পুরনো এবং নামী ভোজনালয়টি যেন আজ ভোজনরসিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। যেখানে সবাই কেবল এক থালা গরম খিচুড়ির নিয়তে কাতারবদ্ধ হয়েছেন।
স্বাদের বৈচিত্র্য ও লোকজ রসায়ন :
বাংলাদেশে বৃষ্টির দিন কিংবা কনকনে শীতের সকালে খিচুড়ির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী আর এই খাবারের বৈচিত্র্যও রীতিমতো বিস্ময়কর। চাল আর ডালের চিরকালীন মিতালিতে তৈরি এই পদের সাথে কখনো মেশে নানা পদের শীতকালীন সবজি, কখনো বা তা হয়ে ওঠে আমিষের স্বাদে ভরপুর ভুনা খিচুড়ি। কোথাও দানা বড় রেখে ঝরঝরে মেজাজ, আবার কোথাও লোকমুখে কথিত সেই আদুরে ‘লেটকা’ বা পাতলা খিচুড়ি—যার সাথে এক টুকরো লেবু-মরিচ বা আচার থাকলে আর কিছুই লাগে না।
সাধারণ চাল-ডাল ছাড়াও বিন্নির চাল, বাজরা কিংবা সাবুদানার ব্যবহার লক্ষণীয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্রত বা উপবাসের দিনে যখন দানাশস্য গ্রহণের বাধা থাকে, তখন এই সাবুদানার খিচুড়িই হয়ে ওঠে তাদের রসনার প্রধান আশ্রয়।
প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় চাল-ডালের মিতালি :
খিচুড়ির এই জয়যাত্রা কিন্তু আজকের নয়, এর শিকড় প্রোথিত আছে হিমালয়ান উপমহাদেশের অতি প্রাচীন ইতিহাসে। সংস্কৃত শব্দ ‘খিচ্চা’ থেকে আসা এই খাবারের জয়গান গেয়েছেন যুগে যুগে আসা বিদেশি পর্যটকরাও। গ্রিক দূত সেলুকাস থেকে শুরু করে মেগাস্থিনিসের লেখায় মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজকীয় হেঁশেলে চাল ও ডালের অপূর্ব মিশ্রণের কথা পাওয়া যায়।
মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যখন এ দেশে আসেন, তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন কী করে মুগ ডাল আর চালের সংমিশ্রণে ‘কিশরি’ তৈরি হয় যা মানুষের পরম প্রিয়। ইতিহাসের পাতায় আরো পাওয়া যায় রাশিয়ান পর্যটক আফনাসিই নিকতিন কিংবা ফরাসি পরিব্রাজক তাভেনিয়ের কথা, যারা সতেরো শতকে ভারতের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে খিচুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
মুঘল আভিজাত্য ও রাজকীয় পাকশালে :
মুঘলাই আভিজাত্যে খিচুড়ি আরো এক ধাপ ওপরে উঠে গিয়েছিল। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরিতে’ বিভিন্ন ধরনের খিচুড়ি প্রস্তুতপ্রণালীর বর্ণনা দিয়েছেন।
জানা যায়, সম্রাট আকবর এতটাই উদার ছিলেন যে, প্রতিদিন প্রায় ৩০ মণ বা ১২০০ কেজি খিচুড়ি রান্না করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এমনকি সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রিয় ছিল পেস্তা ও কিসমিস দিয়ে তৈরি বিশেষ ‘লাজিজান’ এবং আওরঙ্গজেব পছন্দ করতেন মাছ ও ডিম সমৃদ্ধ ‘আলমগিরি খিচুড়ি’। ব্রিটিশ আমলেও এর রেশ ছিল প্রবল, যা থেকে বিলেতি ‘কেজেরি’ (Kedgeree) নামক খাবারের উদ্ভব ঘটেছিল।
রসনার চিরন্তন সম্রাট :
ইতিহাসের সেই রাজকীয় রসুইঘর থেকে শুরু করে আজকের মতিঝিলের খাবার ঘর— যুগ পাল্টেছে কিন্তু খিচুড়ির প্রতি বাঙালির আদিম তৃষ্ণা এতটুকু কমেনি!
সময়ের বিবর্তনে অনেক ভিনদেশি খাবার আমাদের পাতে জায়গা করে নিলেও, এক পশলা বৃষ্টির পর খিচুড়ির আবেদন যেন আরো দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে। তাই তো বৃষ্টির দিনে বাসন ভর্তি ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর এক টুকরো ইলিশ ভাজা পেলে বাঙালির খুশিতে পোয়াবারো হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
দিনশেষে রসনার চিরন্তন রাজত্বে খিচুড়িই যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা, তা মতিঝিলের ওই লাইন দেখলেই বোঝা যায়।



