বিশ্বে আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন আম। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্তত ২৬টি দেশে বাংলাদেশি সুস্বাদু রফতানি হচ্ছে। এই তালিকায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন দেশ। গত কয়েক বছরে নিরাপদ ও রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে গড়ে উঠেছে শত শত গ্যাপভিত্তিক বাগান। তৈরি হয়েছে নতুন শিক্ষিত উদ্যোক্তা। আন্তর্জাতিক মানের আম উৎপাদনও বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু উৎপাদনে সাফল্য এলেও রফতানিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।
সঙ্কট সেই পুরনো। উচ্চ বিমানভাড়া, কার্গো সংকট, কুলচেইন ও আধুনিক প্যাকহাউজের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত জটিলতায় আটকে আছে সম্ভাবনাময় এই খাত। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী আম রফতানি কার্যক্রম বড় পরিসরে যাওয়ার পথ আটকে আছে। বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দুই কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট সচিবরা বারবার রফতানির বাধা দূর করার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রতি মৌসুমে আমচাষি ও রফতানিকারকরা একই সমস্যার কথা নতুন করে সামনে আনছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে বিদেশে আম রফতানির উদ্বোধন করেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ। সৌদি আরবসহ ৫ দেশে ৭ টন আম রফতানি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি।
অনুষ্ঠানে আমচাষি, রফতানিকারক, গবেষক ও উদ্যোক্তারা আবারো বিমানভাড়া, কার্গো সংকট, স্ক্যানিং জটিলতা, কোল্ড স্টোরেজ ও প্যাকহাউজের অভাবসহ দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। জবাবে কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিব উভয়েই দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম হলেও রফতানিতে শীর্ষ দশে নেই। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে বছরে লক্ষাধিক টন আম রফতানির সুযোগ রয়েছে। ডিএই’র তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন। ওই বছর আম রফতানি হয়েছে ২০৯ টন। ধারবাহিকভাবে দেশে আম উৎপাদন বেড়ে ২০২৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ ৬২ হাজার টনে। রফতানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ টন। এবছর প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র। ২০২৩ সালে দেশে আম রফতানির রেকর্ড ছিল ৩ হাজার ১০০ টন। এ বছর এই রেকর্ড ভাঙতে চান সংশ্লিষ্টরা।
তবে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বে ২১ জাতের আম রফতানি হয়ে থাকে, যার অনেকগুলোই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৭২ জাতের আম উৎপাদিত হয়, যারমধ্যে জনপ্রিয় জাতগুলো হলো- খিরসাপাত, গোপালভোগ, লেংড়া, ফজলি, হাড়িভাঙ্গা, আম্রপালি ইত্যাদি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের চারটি জাত খিরসাপাত, ফজলী, ল্যাংড়া ও আশ্বিনী জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরাসহ পার্বত্য জেলায় মানসম্মত আম উৎপাদন হয়। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে থাকলেও রফতানিতে শীর্ষ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নেই। বিশ্বের ২৬টি দেশে আম রফতানি হচ্ছে যদিও এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে বেশি আম গেছে যুক্তরাজ্যে, ৬৮৬ দশমিক ২৭৩ মেট্রিক টন। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইতালি, জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কানাডা, ফ্রান্স ও সুইডেনেও বাংলাদেশী আমের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। গত বছর চীন বাংলাদেশের আমের বাজারে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আম রফতানির অনুষ্ঠানের শুরুতেই রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মূল প্রবন্ধে বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আওতায় ২০২২ সালে ‘রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ শুরু হয়। ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলমান এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় উত্তম কৃষি চর্চা, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ জোরদার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪৬ উপজেলায় হাজার হাজার প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬১৫টি গ্যাপভিত্তিক প্রদর্শনী এবং ২ হাজার ৪৭টি রফতানিযোগ্য আম বাগান গড়ে তোলা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক পরিসংখ্যান ডাটাবেজ এফএওস্ট্যাট-২০২৪ অনুযায়ী, আম উৎপাদনে ভারতের পর চীন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। কিন্তু ২০২৫ সালে বিশ্বে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের আম বাণিজ্যের বিপরীতে বাংলাদেশ রফতানি করেছে মাত্র ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন আম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনের পর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে যায়। কুলচেইন, আধুনিক প্যাকহাউজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও আন্তর্জাতিক মানের রেসিডিউ টেস্টিং ল্যাব না থাকাই এর প্রধান কারণ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের আমচাষি ও ফার্মিএগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আম উৎপাদনের পাশাপাশি প্রসেসিং ও প্যাকেজিং সুবিধা বাড়ানো গেলে রফতানি আরো বাড়বে।’
রাজধানীর শ্যামপুরের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জেও আধুনিক প্যাকেজিং হাউজ স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আম রফতানিতে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিমানের ভাড়া অন্য দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সমস্যাগুলো পুরনো। বিগত ২০ বছরেও দেশে প্রয়োজনীয় কার্গো বিমান নিশ্চিত করা যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘সিভিল এভিয়েশনের ছয়টি স্ক্যানিং মেশিনের তিনটিই নষ্ট। অথচ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেয়া হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো দেশে পচনশীল পণ্য এভাবে রফতানি করা হয় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজ নেই, এসি সুবিধা নেই, পর্যাপ্ত স্টোর নেই। দূতাবাসগুলোতেও বাংলাদেশী আমের প্রচারণা দুর্বল।’
কাতারে আম মেলার সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারণা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, ‘গত ৫০ বছর ধরে সবজি ও কৃষিপণ্য রফতানি হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলেও সমাধান মিলছে না।’
রফতানিকারক ও উদ্যোক্তারা বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।’
বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. আব্দুস ছালাম বলেন, দেশে পর্যাপ্ত কোল্ড চেম্বার না থাকায় রফতানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আমের রং পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, এমন একটি জাত রয়েছে যেখান থেকে বছরে তিনবার আম পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য ও বাকৃবির অধ্যাপক এ এস এম গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, ‘প্রি-কুলিং, কোলিং ও রফতানি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না করলে রফতানি বাড়ানো সম্ভব হবে না।’
তিনি কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। কার্গো বিমান ছাড়া আম রফতানিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘আম বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বেশি মিষ্টি আম পছন্দ করে, ইউরোপের মানুষ তুলনামূলক কম মিষ্টি আম খায়। তাই বাজারভেদে জাত নির্বাচন ও রফতানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজস্ব পণ্য রফতানিতে ভাড়া সহায়তা দেয়। তাই আমাদেরও আম, সবজি ও দেশীয় কৃষিপণ্যের রফতানি ভাড়া অর্ধেক করে দিতে হবে।’
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, ‘আমসহ কৃষিপণ্য রফতানির সব ধরনের বাধা দূর করা হবে। আমি নিজেও একজন উৎপাদক ও রফতানিকারক। আমাদের উৎপাদকদের পণ্য রফতানি করতে পায়ের কয়েক জোড়া জুতার তলা ক্ষয়ে গেলেও এই সাহেব থেকে ওই সাহেবের দফতরে ঘোরাঘুরি শেষ হয় না। নানা নীতিমালা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘বিমানের ভাড়া বেশি, ফেয়ার স্পেস সংকট রয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। অচিরেই সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে।’
বিমানের কার্গো ভাড়া প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ভাড়া অনেক বেশি। অচিরেই ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। আগামীতে বেশ কয়েকটি বিমান কেনা হবে। তখন কার্গো সমস্যা সমাধানে হাত দেয়া হবে। বিমান মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে রফতানির ভাড়া কমানোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রায় সব দেশই কোনো না কোনোভাবে প্রণোদনা দেয়। বাংলাদেশকেও সে পথে এগোতে হবে।’
তিনি আরো জানান, ‘চীনকে কাঁঠাল আমদানির আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিন দিন আগে তারা আমদানি করতে সম্মতি জানিয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু প্রবাসীদের লক্ষ্য করে আম রফতানি করলে হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশের মূলধারার ভোক্তাদের লক্ষ্য করে বাজার তৈরি করতে হবে।’
আমের জিনগত বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে রং উন্নত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই নিয়ম মেনে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। আমাদের কীটনাশক নীতিও পরিবর্তন করতে হবে।’
রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সেলিম খান।
অনুষ্ঠানে গ্যাপ (উত্তম কৃষি চর্চা) মেনে আম উৎপাদনে অবদান রাখায় রাজশাহীর মো: আল আমিন, মো: রফিকুল ইসলাম ও খাগড়াছড়ির মংশিতুং মারমাকে সম্মাননা দেয়া হয়। এছাড়া আম রফতানিতে অবদানের জন্য গ্লোবাল ট্রেড লিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানা রাজিয়াকেও সনদ দেয়া হয়।



