আম রফতানি বাড়াতে আগেই বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন

মানসম্পন্ন উৎপাদন বাড়লেও রফতানিতে বাধা অনেক

দেশে মানসম্পন্ন আম উৎপাদন কয়েক বছরে বেড়েছে। রফতানিতে যেসব বাধা রয়েছে, আসছে আম মৌসুম আসার আগেই সরকারকে সেই বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

কাওসার আজম
খামারবাড়িতে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় ক্যালেন্ডার উপস্থাপন করা হয়
খামারবাড়িতে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় ক্যালেন্ডার উপস্থাপন করা হয় |নয়া দিগন্ত

দেশে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হলেও রফতানিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না। পরিবহন ব্যয়, উন্নত জাতের অভাব, প্যাকেজিং ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা- সব মিলিয়ে পদে পদে বাধার মুখে পড়ছে সম্ভাবনাময় এই খাত। এমন বাস্তবতায় মানসম্মত আম রফতানি নিশ্চিতে জাত ও জেলাভিত্তিক আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মানসম্পন্ন আম উৎপাদন কয়েক বছরে বেড়েছে। রফতানিতে যেসব বাধা রয়েছে, আসছে আম মৌসুম আসার আগেই সরকারকে সেই বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

রোববার (৩ মে) রাজধানীর খামারবাড়িতে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় এই ক্যালেন্ডার উপস্থাপন করা হয়। সভায় ডিএই মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে বিশেষজ্ঞ, রফতানিকারক, কৃষি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। দেশের অন্তত ২২টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হচ্ছে এবং কয়েকটি জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল এটি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে উৎপাদিত আমের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১ লাখ ৪৩ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছিল। এর মধ্যে রফতানি হয়েছিল মাত্র ৩০৯ টন। ২০১৯-২০ সালে দেশে প্রায় ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হলেও রফতানি হয়েছে ২৮৩ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমের ফলন হয়েছিল ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন; রফতানি হয় ১ হাজার ৭৫৭ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন; রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১০০ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন; রফতানি হয় ১ হাজার ৩২১ টন আম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন আম উৎপাদন হয়, রফতানি হয় ২ হাজার ১৯৪ টন এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার টনের বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে রফতানিযোগ্য বা কোয়ালিটি আম উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় রফতানির পরিমাণ বাড়ছে না।

রফতানিকারকদের মতে, উচ্চ বিমান ভাড়া এ খাতের সবচেয়ে বড় বাধা। রফতানি মৌসুমে ভাড়া দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি উন্নত জাতের অভাব, স্বল্পস্থায়ী স্থানীয় জাত, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ঘাটতি, নতুন বাজার সৃষ্টিতে সমন্বয়হীনতা এবং ব্র্যান্ডিং সংকটও রফতানিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

গতবছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রফতানি শুরু হলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপেক্ষাকৃত কম পরিবহন ব্যয়ের কারণে চীন বড় সম্ভাবনাময় বাজার হতে পারে। এছাড়া রাশিয়াকেও নতুন সম্ভাব্য বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ অবস্থায় রোববার রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে অংশীজনদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতেও আলোচনায় অতিরিক্ত বিমানভাড়াসহ রফতানির বাধাগুলো গুরুত্ব পায়।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের আম বিশ্বের ৩৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে আগামী ২০ মে থেকে রফতানি শুরু হয়ে প্রায় ৭৮ দিন চলবে। তবে দেরিতে ফলনশীল জাতের আমে গুরুত্ব বাড়ালে এই সময়সীমা ১০০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।

ডিএই প্রকাশিত ক্যালেন্ডারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অপরিপক্ক আম সংগ্রহ বন্ধ করে রফতানিযোগ্য আমের গুণগত মান নিশ্চিত করা। বক্তারা বলেন, অনেক সময় আগাম আম সংগ্রহের কারণে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। তাই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আম সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু ও ভৌগলিক কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পাকার সময় ভিন্ন হয়। দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা ও পার্বত্য এলাকায় আম আগে পরিপক্ক হয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও বৈশাখী জাতের আম ৫ মে থেকে সংগ্রহ শুরু হবে এবং গৌরমতি জাত ১৪ আগস্ট থেকে তোলা যাবে। ফলে মে থেকে শুরু হয়ে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আম সংগ্রহ চলবে।

সভায় জানানো হয়, আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন, নওগাঁয় ৪ লাখ ২১ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন, রাজশাহীতে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন এবং সাতক্ষীরায় ৭০ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আম রফতানি ও বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন।

রফতানিকারকরা আরো জানান, ভারত, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো আলাদা কার্গো ফ্লাইট ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এখনো যাত্রীবাহী বিমানের ওপর নির্ভরশীল। এতে খরচ বাড়ছে। এছাড়া প্যাকিং হাউস ও রফতানি পয়েন্ট ভিন্ন স্থানে হওয়ায় ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে।

রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ২০২২ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং কৃষকদের সাথে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত রফতানিতে বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই বলেও তিনি জানান।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবহন ব্যয় কমানো, উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের আম রফতানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে সঠিক সময়ে পরিপক্ক আম সংগ্রহ এবং মানসম্মত সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।