সরকারি ভর্তুকি সহায়তায় কৃষকের হাতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে গত সরকারের আমলেই স্থবির হয়ে পড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি এবার পুরোপুরি গুটিয়ে নেয়ার পথে হাঁটছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমে যন্ত্র সঙ্কটে পড়তে পারেন কৃষকরা। বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয় ও ফসলহানির ঝুঁকি।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ অনুমোদন দেয়া হয়। তখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন ড. আব্দুর রাজ্জাক। প্রকল্পের আওতায় সমতল এলাকায় ৫০ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়ে কৃষিযন্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা নেয়া হয়। লক্ষ্য ছিল দেশজুড়ে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শ্রমিক সঙ্কট মোকাবেলা করা। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং তদন্তে বাধা দেয়ার অভিযোগে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৩ সালে প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন করে দেশব্যাপী ছয়টি এনফোর্সমেন্ট অভিযান শুরু করে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুন থেকে প্রকল্পটিতে ভর্তুকি প্রদান স্থগিত করে তৎকালীন সরকার। ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর প্রকল্প পরিচালক সফিউজ্জামান অব্যবহৃত অর্থের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেন। পরে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মো: মঞ্জুর-উল-আলম নিয়োগ পান। তার দায়িত্ব নেয়ার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বেচে যাওয়া ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয় এবং সেটি আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জানা যায়, পরিকল্পনা কমিশনের শর্ত অনুযায়ী প্রকল্প সংশোধন করে অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এর কিছুদিন পরই আবার অবস্থান বদলায় কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকল্প মেয়াদে কেবল বেতন-ভাতা ও প্রশিক্ষণ খাতে ২০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এবং বাকি ৪৮২ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেয়া হবে। অর্থাৎ নতুন করে আর কোনো কৃষিযন্ত্র বিতরণ করা হবে না।
সূত্র জানায়, গত ২৫ নভেম্বর সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার এ বিষয়ে কড়া মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ছাড়া কিছু করতে পারেননি। বাকি টাকা ফেরত না দিয়ে এবার স্বচ্ছভাবে কাজ করুন। প্রয়োজনে আরো ২০০–৩০০ কোটি টাকা নিয়ে মেয়াদ বাড়ান। কৃষকের কোনো উপকার না হলে নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হবে না।’
এর জবাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) মির্জা আশফাকুর রহমান বলেন, প্রকল্পটিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। আপাতত ৫০২ কোটি টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা রেখে বাকি ৪৮২ কোটি টাকা ফেরত দিয়ে প্রকল্পটি শেষ করতে চায় মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে তা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বন্ধ থাকলে আসন্ন বোরো মৌসুমে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হতে পারে। দেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। মোট আবাদি জমির প্রায় ৮০ শতাংশেই ধান চাষ হয়, যার অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জমিতে যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা হয়ে থাকে। যন্ত্রের অভাবে ধান কাটা দেরি হলে ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা হতে পারে। হাতে ধান কাটলে শ্রমিক খরচও বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
হাওর অঞ্চলে ঝুঁকি আরো বেশি। সেখানে কম্বাইন হারভেস্টারই এখন ধান কাটার প্রধান ভরসা। সামান্য দেরিতেই আকস্মিক বন্যায় পুরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা চালের বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান অর্থ দিয়েই নতুন করে যন্ত্র বিতরণ, নষ্ট যন্ত্র মেরামত, কেন্দ্রীয় মেরামতকেন্দ্র ও পরীক্ষাগার স্থাপন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পুরো প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে। আর এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছেন দেশের কৃষকরা।
দেশের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে যেত। শ্রমিকের অভাবে পাকা ধান কৃষকের চোখের সামনেই তলিয়ে গেলেও কিছু করার থাকেনি তখন। এমন প্রেক্ষাপটে বিগত সরকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’ হাতে নেয়। কিন্তু শুরু থেকেই এই প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। প্রথম পিডি বেনজীর আলম ডিএইর পরবর্তীতে ডিজি হন। তার হাত ধরেই এই প্রকল্পে দুর্নীতির শুরু। পরবর্তীতে যন্ত্রপাতি বিতরণ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ পিডি তারেক মাহমুদুল হাসানকে সরানো হয়। তিনিসহ মাঠের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু যন্ত্র বিতরণ ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে যাদের সমন্বয়ে দুর্নীতির বড় অভিযোগ সেই যন্ত্র সরবরাহকারী সেই কোম্পানিগুলো এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিগত সরকারের শেষ সময়ে পিডির দায়িত্ব পান সফিউজ্জামান। তিনি প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেন। পরে তাকে সরিয়ে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মো: মঞ্জুর-উল-আলম নিয়োগ পান। তার দায়িত্ব নেয়ার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বেচে যাওয়া ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয় এবং সেটি আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু শেষ সময়ে এই প্রকল্প আর না চালানো সিদ্ধান্ত নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। আজ এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা যায়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি বেশি এবং সময় মতো শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিত করা হচ্ছিল। কিন্তু যন্ত্রের দাম বেশি হওয়ায় ভর্তুকি ছাড়া কৃষকদের পক্ষে তা কেনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা জরুরি।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।



