কুষ্টিয়ায় নতুন পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী, চাষিরা হতাশ

এবার কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৫৫ হাজার ২০০ টন।

আ ফ ম নুরুল কাদের, কুষ্টিয়া

Location :

Kushtia
কুষ্টিয়ার কাঞ্চনপুর পেঁয়াজের হাটে ব্যবসায়ীরা
কুষ্টিয়ার কাঞ্চনপুর পেঁয়াজের হাটে ব্যবসায়ীরা |নয়া দিগন্ত

কুষ্টিয়ায় নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু বাজারে দাম নিম্নমুখী। এই অবস্থায় হতাশা বিরাজ করছে পেঁয়াজ চাষি ও পরিবারের মাঝে। আবহাওয়া অনুকূল, উৎপাদন ভালো, গুণগত মান ভালো, তবে উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারমূল্য অনেক কম হওয়ায় মাঠ থেকে অনেকে পেঁয়াজ তুলতে অনীহা দেখিয়ে নতুন পেঁয়াজ তুলতে সময় নিচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা।

কুষ্টিয়া কৃষি অধিদফতরের তথ্য বলছে, মুড়িকাটা ও হালি- এই দুই পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ কুষ্টিয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দু’বছর ধরে চাষিরা পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে রয়েছেন বলে জানান কর্মকর্তারা। এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজে চাষিরা বেশি ক্ষতির মধ্যে পড়েনি। তবে শেষ মুহূর্তে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম একেবারেই কমে গিয়েছিল। আর তাতে চাষিরা লোকসানের মধ্যে পড়েন। বহু আশা-ভরসা নিয়ে এবার হালি পেঁয়াজের চাষ করেছেন চাষিরা। মাঠের বর্তমান অবস্থা এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষিরা। কিন্তু শুরুতেই চাষিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

সোমবার (৯ মার্চ) কুষ্টিয়ার বিভিন্ন হাট ও বাজারের চিত্র ছিল আতঙ্কের মতো। শহরের পৌর পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ বেচাকেনা হয়েছে ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা মণ।

খোকসা জয়ন্তি হাজরা ইউনিয়নের মাবুদপুর গ্রামের শাহাদত সর্দার ১০ বস্তা নতুন পেঁয়াজ বিক্রির জন্য এনেছেন। কিন্তু বাজার দামে মুখ মলিন হয়ে যায়। তিনি জানান, উত্তোলনের মুহূর্তে কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা পেঁয়াজের মণ না দিলে চাষিরা ক্ষতির মধ্যে পড়বেন। তবে দুই হাজার টাকার ওপরে দাম থাকলে চাষিরা বাঁচবে।

খোকসা ফুলবাড়ি গ্রামের মসলেম আলী জানান, বাজারে পাইকারি ২৫ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি তাদের জন্য কষ্টকর। তিনি ১৩ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। ঈদের আগে টাকার প্রয়োজনে কয়েক কাঠা জমির পেঁয়াজ তুলে হাটে এনেছেন। কিন্তু বাজার দামে তিনি হতাশ। মাঠে প্রচুর পেঁয়াজ ওঠার অপেক্ষায় বাজার মন্দার কারণে চাষিরা মাঠ থেকে পেঁয়াজ উত্তোলন বিলম্বিত করছেন।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এবার কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৫৫ হাজার ২০০ টন। গত বছর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ২৪ হেক্টর জমি, আবাদ হয়েছিল ১৩ হাজার ৯৭৯ হেক্টর জমিতে। গত বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ নয় হাজার ২২৪ টন। আর উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৬৪ টন পেঁয়াজ।

জেলায় প্রতিবছর পেঁয়াজের আবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ খরচ করে বিগত দুই বছর লোকসানের মধ্যে চাষিরা। এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজে চাষিরা সামান্য লাভের মুখ দেখেছে। কিন্তু হালি পেঁয়াজের শুরুতেই চাষিরা হোঁচট খেতে শুরু করেছেন।

জেলার সদর উপজেলা, কুমারখালী ও খোকসায় বেশি পরিমাণ পেঁয়াজের আবাদ হয়। পেঁয়াজের বীজ, সার, কীটনাশক ও লেবার খরচ দিয়ে এক বিঘা জমিতে খরচ পরে ৫০ হাজার টাকার বেশি। সেখানে দুই হাজার টাকা মণ দাম হলে চাষিরা স্বস্তিতে থাকতে পারেন।

সরেজমিনে সোমবার সদর উপজেলার বরিয়া টাকিমারা, কমলাপুর, ভাদালিয়া, কাঞ্চনপুর, জিয়ারখি, হররা মেটনসহ বিভিন্ন মাঠে বিস্তর পেঁয়াজের আবাদ দেখা গেছে। অনেক স্থানে পেঁয়াজ উত্তোলন করছে, আবার অনেক স্থানে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা করছেন কৃষকরা। বর্তমান আবহাওয়ার খবরে অনেকে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অন্য বছরের তুলনায় উৎপাদন অনেক ভালো বলে চাষিরা জানান।

বরিয়া গ্রামের আকবর হোসেন বলেন, ‘চাকরির পাশাপাশি নিজেদের কয়েক বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছি। অনেক ভালো পেঁয়াজ হয়েছে। তবে দাম কম হওয়ায় এখনো মাঠ থেকে তুলি নাই। ঈদের পর ভরপুর পেঁয়াজের আমদানি হবে। আর বাজারে পাইকারি ক্রেতারা কেনা শুরু করলে পেঁয়াজের দাম আরো বাড়বে বলে আশা করছি।’

টাকিমারা গ্রামের কৃষক কারিমুল বলেন, ‘পেঁয়াজ চাষে অনেক পরিশ্রম ও খরচ। আমাদের এলাকার মানুষরা পেঁয়াজ চাষে সাংঘাতিক আগ্রহী। এলাকায় চাষিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়, কে কত বেশি দামের ও ভালো মানের বীজ দিয়ে পেঁয়াজের চারা উৎপাদন এবং রোপণ করতে পারে? আর এবার আবহাওয়া চাষিদের অনুকূলে থাকায় সবাই ভালো ফলাফল আশা করছে।’

হররা গ্রামের চাষি মোজাম্মেল হক জানান, পেঁয়াজের মূল্য মণ প্রতি দুই হাজার টাকা নির্ধারণ করলে চাষিরা লাভবান হয়ে আরো বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ চাষে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশারুল হক বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন আশা করছি। চাষিরা পেঁয়াজ উৎপাদনে খুশি, তবে বাজারমূল্য কম হওয়াতে চাষিরা আশাহত হয়েছেন। আশা করছি, অল্পদিনের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার ভালো হবে, তাতে চাষিরা উৎফুল্ল হয়ে বেচাকেনা করতে পারবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘পেঁয়াজের বিক্রি মূল্য দুই হাজার টাকার বেশি হওয়া দরকার। কেননা পেঁয়াজ চাষে চাষিদের খরচের প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।’