আজ ৫ আগস্ট। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দুই বছরপূর্তি। হাসিনা পালানোর পাশাপাশি দীর্ঘ দিনের দুঃশাসনেরও পতন ঘটে ২০২৪ সালের এই দিনে। পতন হয় হাসিনা রেজিমের ফ্যাসিজমের। প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা আর ২০ হাজারের বেশি লোককে পঙ্গু করে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে এ দিনে বিশেষ ব্যবস্থায় ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্টজননী হাসিনা। দেশকে চরম সঙ্কটে ফেলে দিয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের কথা চিন্তা না করে নিজের জীবন নিয়ে বোন রেহানাসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে সাথী করে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন পতিত প্রধানমন্ত্রী। সে থেকেই ভারতে অবস্থান করে আসছেন তিনি। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতাসহ অনেকেই গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পালানোর আগেই হাসিনা তার পরিবারের সব সদস্যকে নিরাপদে দেশ থেকে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। হাসিনার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে দু’দিন আগেই এক দফার ডাক আসে। কিন্তু সেই এক দফার ডাক যে অত তাড়াতাড়ি কার্যকর হবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। হাসিনার খুনি বাহিনী তখন চরম উন্মাদনায় খুনের নেশায় মত্ত। হাতের নাগালের মধ্যে পেলেই আন্দোলনকারীদের জীবনসাঙ্গ হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছিল লাশের স্তূপ। আহতদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে হিমশিম অবস্থা। ৫ আগস্ট ভোরেও কেউ বুঝতে পারেনি কী হতে যাচ্ছে। ওইদিনই যে দেশের গণমানুষের মুক্তির সূর্য উঠবে তা কেউ ধারণাও করতে পারেননি। সে দিনই যে শেখ হাসিনা পালাবেন দেশের মানুষ তা বিশ্বাসও করতে পারেনি। হঠাৎই দুপুরের দিকে চার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে হাসিনা পালিয়েছে। হাসিনার সেই পালানোর দৃশ্যের ছোট একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। মানুষ রাস্তায় নেমে আসে বিজয়োল্লাসে।
সেই বিজয়োল্লাসেও হাসিনার বাহিনী নির্বিচার গুলি চালিয়ে কোথাও কোথাও বিপ্লবীদের হত্যা করে। সাভারে হত্যার পর গুমের জন্য লাশ আগুনে পুড়ে ফেলা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকার পতনের এক দফা দাবির মুখে শেখ হাসিনা বাধ্য হন দেশ ছেড়ে পালাতে। পদত্যাগ করে বেলা আড়াইটার দিকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়েন তিনি। তার সাথে ছোট বোন শেখ রেহানা ছিলেন। হেলিকপ্টারটি ভারতের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে শেখ হাসিনার শেষ গন্তব্য নিয়ে তখন ধোঁয়াশা ছিল। পদত্যাগের আগে শেখ হাসিনাকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৪৫ মিনিট সময় বেঁধে দেয়া হয়। তিনি যখন দেশ ত্যাগ করেন তখন গণভবনের পাশে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা অপেক্ষা করছিল ভেতরে প্রবেশের জন্য। শেখ হাসিনার পলায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের একজন ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধানের লজ্জাজনক বিদায় ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন লজ্জাজনক বিদায় ঘটেছে হাতেগোনা কয়েকজন স্বৈরাচারের।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ’২৪-এর ১১ জানুয়ারি। এর আগে ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮-এর নির্বাচন থেকে তার ক্ষমতায় আসার প্রতিটি নির্বাচনই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। একটি নির্বাচন ছিল বিনা ভোটের, একটি ছিল রাতের ভোটের এবং সর্বশেষ ’২৪-এর নির্বাচন ছিল নিজ দলেরই ডামি প্রার্থী দিয়ে। জনগণের রায় প্রতিবারই তিনি উপেক্ষা করে ক্ষমতায় এসেছেন। এভাবে কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন দেশের মানুষ। কিন্তু জোরালো প্রতিবাদ করার ক্ষমতা কারোরই ছিল না। যারা রাস্তায় নেমেছেন তারা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন বছরের পর বছর। জেল-জুলুম-অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। হত্যা-গুমের শিকার হয়েছেন। শেখ হাসিনা তার পেটোয়া বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে তার অনুগত সদস্যদের দিয়ে প্রতিবাদীদের দমন করেছেন। মানুষের বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এমনকি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন উলঙ্গভাবে।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসেন প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন হয় একতরফা, যেখানে বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই নির্বাচন আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারার ব্যাপক অভিযোগ ছিল। এ নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। আর ২০২৪-এর জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে এ নির্বাচনও বিতর্কিত। এতেও প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। নিজদলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী করে ‘ডামি’ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আয়োজন করা হয়। এ নির্বাচনটিকে বিরোধীরা ‘ডামি নির্বাচন’ বলে আখ্যা দেন। ছয় মাসের মাথায় ব্যাপক ছাত্র ও গণবিক্ষোভের মুখে তিনি ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে লজ্জাজনকভাবে হেলিকপ্টারে দেশ থেকে পলায়ন করেন।
ব্যাপক রক্তক্ষয়ের পর চব্বিশের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ঘোষণা দেন পর দিন ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির। এই কর্মসূচি ঠেকাতে রাত থেকেই রাজধানীর প্রবেশদ্বারগুলোয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এই পুলিশ সদস্যরা ছিল ফ্যাসিস্ট সরকার ও হাসিনার একান্ত অনুগত। তারা দায়িত্ব নিয়েছিল যাতে বাইরে থেকে একজন আন্দোলনকারীও ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে।
এ দিকে ফজরের আগেই রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জড়ো হয়ে যায় রাজধানীতে প্রবেশের জন্য। তাদের উপর ভোরে বিভিন্ন স্থানে গুলি চালানো হয়। বেলা যত গড়াতে থাকে ছাত্র-জনতার ঢল তত বাড়তে থাকে। তাদের টার্গেট একটাই গণভবন। যেকোনোভাবে তারা গণভবনে যাবেন এবং শেখ হাসিনাকে উচ্ছেদ করবেন।
এ দিকে বিক্ষুব্ধদের এই রোষ সেনাবাহিনী বুঝতে পেরে ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন। তারা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তাকে দেশত্যাগের অনুরোধ করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা এতে কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না। একটি সূত্র জানায়, একপর্যায়ে তিনি দেশত্যাগে রাজি হন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পাসপোর্ট নিয়ে দেশত্যাগ করতে চান। প্রধানমন্ত্রীর পাসপোর্ট নিয়ে তিনি কোনো দেশে গেলে সেই দেশ তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল। শেখ হাসিনা এই সুযোগটি নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি সেনাবাহিনী। ওই সূত্রটি জানায়, একপর্যায়ে শেখ হাসিনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীকে অনুরোধ জানান অন্তত জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়ে তিনি দেশ ছাড়তে চান। তখন সেনাসদস্যরা বলেন, ওই সময় নেই। সেনাসদস্যরা তাকে ৪৫ মিনিট সময় বেঁধে দেন। ওই সময়ের মধ্যে রেডি হতে না পারলে জনরোষ থেকে তিনি বাঁচবেন না- এটাও জানিয়ে দেয়া হয়। ওই সময় পুরো দেশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর তিনি তেজগাঁওয়ে রাখা হেলিকপ্টারের উদ্দেশে গণভবন থেকে বের হন। হাসিনা হেলিকপ্টারে ওঠার পরই গণভবন ছাত্র-জনতার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। একই সাথে ইন্টারনেট সংযোগও চালু করে দেয়া হয়।
শেখ হাসিনা পালানোর পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সে দিন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘দেশে আজকে যা ঘটল- এটাই হওয়ার কথা ছিল। গণ-অভ্যুত্থান কখনো ঠেকানো যায় না। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সহজেই সমাধান করা যেত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জেদের কারণে এত মানুষ মারা গেল।’ তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রাণহানির যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। আরো কত লাশ কোথায় পড়ে আছে, কত গণকবর হয়েছে, কতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণ ঝরেছে! তিনি তো চলে গেলেন। এখন এর জবাব দেবে কে?’
তিনি মন্তব্য করেন, ‘১৫ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেননি। দিনের পর দিন ভোট চুরি করা হয়েছে। দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শেখ হাসিনার বোঝা উচিত ছিল, তিনি ও তার দল কতটা অজনপ্রিয়। এই যে এত প্রাণহানি, এর জবাব দেবে কে? দেশে সুশাসনের মারাত্মক অভাব। তিনি সুশাসন দিতে পারেননি।’
‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর হাজার হাজার গুলি ছোড়া হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে।’
‘এর আগে আমরা সবাই এইচ এম এরশাদকে স্বৈরাচার বলেছি। তখন মাত্র ছয়জন মানুষ মারা যাওয়ায় তাকে স্বৈরশাসক বলছি। কিন্তু গত ১৫ বছরে কত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।’ ‘২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তা মারা গেছেন। এখন এর জবাব দেবে কে?’
সাখাওয়াত হোসেন উল্লেখ করেন, ‘যাকে জাতির পিতা বলা হয়, তার পরিবারের সদস্যদের এত করুণ পরিণতি কেন হবে? তার এমন পরিণতি আমাদের দেখতে হলো। এসব হয়েছে, তার দম্ভ ও অহমিকার কারণে।’
শেখ হাসিনার পালানোর কথা শোনার পরই লাখ লাখ মানুষ নেমে আসে রাজপথে। গ্রামগঞ্জেও সেই উল্লাসের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। হাসিনামুক্ত দেশে মুক্তভাবে শ্বাস নেয় মানুষ। সেই উল্লাসের অংশীদার ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
হাসিনার পতনের সেই বিজয়োল্লাস এখনো অব্যাহত। দিনটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন আজ রাজধানীসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারি ও বিরোধীদলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী দিন। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বিরাজ করে। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করেন।
দুপুরের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। এরপর মুহূর্তেই রাজধানীজুড়ে শুরু হয় বিজয় মিছিল। শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরো উত্তাল হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি না থাকায় সেখানে প্রবেশ করেন বিক্ষুব্ধ জনতা। একই সময়ে সংসদ ভবন, ধানমন্ডির সুধা সদন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, প্রধান বিচারপতির বাসভবন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপরও হামলার খবর আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এক ভিডিও বার্তায় শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। একই ধরনের আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব বন্দীর মুক্তি, শহীদদের জাতীয় বীর ঘোষণা এবং অন্তর্বর্তী জাতীয় সরকারের রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানান।
সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, শহীদদের প্রতি শোক প্রস্তাব গ্রহণ, আহতদের চিকিৎসা, নিহতদের পরিবারকে সহায়তা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি জানান, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে এবং দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে নির্বাচনের পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠক করেন। শেখ হাসিনা ভারতের গাজিয়াবাদে পৌঁছানোর খবর প্রকাশিত হয়। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন।
তবে সরকার পতনের আনন্দের পাশাপাশি ৫ আগস্ট ছিল রক্তাক্তও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ী ও আশুলিয়ায় প্রাণহানির ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও বহু মরদেহ আনা হয়। একই দিনে যশোরে একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ২৪ জন নিহত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, কয়েকটি কারাগারে হামলা এবং অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে।
৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণের দিন হিসেবে স্থান করে নেয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনার মধ্য দিয়ে দিনটি ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।
আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন পতন
মনিরুল ইসলাম রোহান
আজকের দিনে গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ও একচ্ছত্র শাসনের নজিরবিহীন পতন ঘটে। ব্যাপক আন্দোলন, দমনপীড়ন এবং রাজনৈতিক তীব্র সঙ্কটের মধ্য দিয়ে শাসক দলটির ঐতিহাসিক পতন নিশ্চিত হয়। ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে দেশ থেকে হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী আমলের অবসান ঘটে। বলা হয়ে থাকে, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, ভিন্নমত দমন এবং গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসনের কারণে পতন ত্বরান্বিত হয়। তা ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় শক্তি চরমভাবে ব্যবহার করা হয়।
৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর শীর্ষ নেতারা দেশত্যাগ করেন এবং দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও অস্তিত্ব চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, গ্রেফতার এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র সঙ্কট দেখা দেয় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এটি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে সঙ্কটের শুরু হয়। এর আগে ২০১১ সালে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পদ্ধতি বাতিলের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। তারপর সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ‘আমি আর ডামি’ নামক আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সাধারণ জনগণের অসন্তোষের কারণে পরিণত হয়। এরপর বছরের মধ্যসময়ে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে আওয়ামী লীগ রাজপথে চড়াও হয়। তখন রাজপথ অগ্নিগর্ভ হয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনে। তারই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতন ঘটে এবং অবসান ঘটে দেশের জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা নতুন আরেক স্বৈরশাসকের। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সরকার ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সব পর্যায়ের নেতৃবন্দ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সব মন্ত্রী-এমপিরাও আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমান, আবার কেউ কেউ বিমানযোগে বিদেশে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের টপ টু বটম এভাবে পলায়ন শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও এটা নজিরবিহীন হিসেবে ধারণা করা হয়।
ওই ঘটনার পর থেকে আজ অবধি আওয়ামী লীগ দেশের অভ্যন্তরে দলীয়ভাবে প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি, আওয়ামী লীগের কোনো পদধারী নেতা প্রকাশ্যে কোনো সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেননি, এমনকি কোনো নেতা সংবাদ সম্মেলন করেও রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেননি। এ দিকে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশ-বিদেশে অবস্থান করা সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা বলা কয়েকটি অডিও প্রকাশ হয়েছে, যা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অবশ্য বিদেশে বসে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব কয়েকটি হরতাল অবরোধ ঘোষণা করলে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। যদিও ৫ আগস্টের পর দলীয় ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং ওই পেজের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জোরালোভাবে তুলে ধরছে। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের স্থায়ী কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন সময় দলের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মসূচি তুলে ধরছেন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নিজেদের ভুলের কারণে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে সঙ্কটময়কাল পার করছে পতিত দলটি। পতনের মাত্র চার মাসের মাথায় হওয়া বিদেশী গণমাধ্যমের এক জরিপে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে দেশের মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও অপরাধের মাত্রা এত বেশি দীর্ঘ যে গত দুই বছর পার হতে চললেও পতিত দলটির জন্য দেশের মানুষের মন গলেনি, তারাও ফিরে আসতে পারেনি। কিছু সুশীল নামধারী আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মাঝে মধ্যে টিভি টকশোতে ভিন্ন ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। পতিত দলটির সমর্থকগোষ্ঠীর কেউ কেউ এখনো সোস্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন- ‘শেখ হাসিনা আসছে, বাংলাদেশ হাসছে!’ এ দিকে খোদ শেখ হাসিনাও বিদেশী গণমাধ্যমে এক সাক্ষাতকারে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন এমন ঘোষণা দিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনার খোরাক যুগিয়েছেন।
চট্টগ্রামের সব মানুষ রাস্তায়
বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তথা ৩৬ জুলাই শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর এই দিনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কোনো মানুষ বাসা-বাড়িতে ছিলেন না। নারী-পুরুষ-শিশুসহ পরিবারের সব সদস্য একযোগে জাতীয় পতাকা হাতে নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। মানুষের চোখে মুখে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, যেন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। ১৬ বছর পর মানুষ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচেন।
সেদিন চট্টগ্রামের সড়কে সড়কে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। দুপুরে হাসিনা পালানোর খবরে মুহূর্তেই নগরীর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বায়েজিদ, জিইসি, আগ্রাবাদ, এ কে খান, কাজীর দেউড়ি, প্রবর্তক, চকবাজার, জামালখান, নিউমার্কেট মোড়সহ নগরীর সব অলিগলি জাতীয় পতাকাবাহী মানুষে ছেয়ে যায়। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অটো রিকশায় চড়ে জাতীয় পতাকা হাতে উল্লাশ করেছেন, কেউ গাড়িতে জাতীয় পতাকা মুড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে সম্মিলিতভাবে উল্লাস মিছিল করেছেন, কেউবা পটকা ফুটিয়ে মেতে ছিলেন সড়কে সড়কে। এ সময় উল্লাসরত মানুষগুলোর মুখে ধ্বনিত হচ্ছিল- ‘পালাইছেরে পালাইছে, শেখ হাসিনা পালাইছে,’ ‘ছি ছি হাসিনা’, ‘পালাইছে রে পালাইছে, ভারতে পালাইছে’ ইত্যাদি স্লোগান। এ সময় ছাত্র-জনতা নগরীর বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিবের ছবি ও মুরাল ভাঙচুর করার দৃশ্যও ছিল চোখে পড়ার মতো।
হাসিনা পালানোর পরপরই চট্টগ্রাম মহানগরী জুড়ে চলে শিক্ষার্থীদের বিশাল কর্মযজ্ঞ। কেউ নিয়ন্ত্রণ করছেন ট্রাফিক ব্যবস্থা। কেউ আছেন সড়ক পরিষ্কারে। কেউ ব্যস্ত থানাগুলোর পাহারায়। আবার কেউ বা দেয়ালে দেয়ালে আঁকছিলেন গ্রাফিতি। শিক্ষার্থীদের এমন কর্মযজ্ঞ জনসাধারণকে রীতিমতো বিস্মিত করেছিল।
স্বাধীনতা এনেছি যখন, সংস্কার করি’, ‘ইতিহাসের নতুন অধ্যায় জুলাই ২৪’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো জুলাই’, ‘ভাই কারও পানি লাগবে, পানি’- চট্টগ্রাম শহর সেজেছিল এমন গ্রাফিতির মোড়কে। দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল মিছিলের গান অথবা স্লোগান। স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের বর্বরতা হত্যার বিচার বা ক্ষোভের কথা। শিক্ষার্থীদের তুলির আঁচড় যেন হয়ে উঠেছিল পায়রার ডানা।



