জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিল নিয়ে আপত্তি এবং বিলটি পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেয়ার প্রতিবাদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করেছে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন এত অল্প সময়ে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়ে কমিটির স্বাধীনভাবে মতামত দেয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
রোববার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতের দুই সদস্য ড. মো. নাজিবুর রহমান ও অ্যাডভোকেট আল ফারুক আবদুল লতিফ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত বিলটি পর্যালোচনার জন্য উত্থাপনের পর তারা বৈঠক বর্জন করে বেরিয়ে আসেন।
রোববার (৩০ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠক জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, এমরান আহমদ চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা, মো: মনজুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও আলফারুক আব্দুল লতীফ অংশ নেন।
বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ড. মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিলটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজন ও সুধী সমাজও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর পর কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অংশীজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
নাজিবুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরো শক্তিশালী একটি আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু নতুন করে যে আইনটি আনা হয়েছে, সেটি আগের চেয়েও দুর্বল করা হয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিভিন্ন সুধীজনের মতামত চেয়েছিল। কারা কী মতামত দিয়েছেন এবং সেই মতামতের কতটুকু প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা জানার অধিকার সংসদীয় কমিটির রয়েছে। কিন্তু মাত্র দুই দিনের সময়সীমার কারণে কমিটি সেই অধিকারও যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না।’
জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, তড়িঘড়ি করে বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা এ ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না এবং এর কোনো দায়ভারও নিতে চান না।
তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার সুরক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এ কারণে তারা বিলটিকে ‘কালো আইন’ হিসেবে দেখছেন।
বৈঠকের আগে সংসদে বিলটি নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘এ আইন নিয়ে আজ নতুন করে আলোচনা হচ্ছে না। এটি আগে অধ্যাদেশ আকারে ছিল। সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সময়ও তারা আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কোনো বক্তব্যই আমলে নেয়া হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকার কার সাথে পরামর্শ করেছে এবং কী ধরনের মতামত পেয়েছে, সেসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। কমিটির সদস্য হিসেবে এসব নথি দেখার অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।’
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের মত দমনের জন্য সংসদের ভেতরে হুমকির পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এ ধরনের বক্তব্য সংসদ সদস্য হিসেবে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার অধিকার ও মর্যাদাকে আঘাত করছে।’
নাজিবুর রহমান বলেন, “এর আগে সংসদ থেকে তাদের ওয়াকআউটও ছিল সংসদীয় ‘ফ্যাসিবাদের’ প্রতিবাদ। মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত বিল নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির রিপোর্টেও তাদের বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নিচ্ছে না।”
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার যেভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত আইন করে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে দিয়েছিল, প্রস্তাবিত আইনেও একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
গত ১৭ বছরে গুমসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘ভবিষ্যতে কোনো সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠলে বা জনগণের ওপর নিপীড়ন চালালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যাতে কার্যকরভাবে কথা বলতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এর ক্ষমতা আরো সীমিত করা হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।’
বৈঠক বর্জনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘ভুক্তভোগী জনগণ, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত উপেক্ষা করে সরকার একতরফাভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ রহিত করেছে। অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরো শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক জোট জিএএনএইচআরআই স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপলস এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়ে জনগণের সাথে যথাযথ মতবিনিময় এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছে। ফলে কমিটিকে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সেহেতু আমরা কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা এই বিলের কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনায় অংশ না নেয়া এবং বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই বৈঠকে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য দিয়ে চলে এসেছি।’
‘এই প্রক্রিয়ার সাথে আমরা যুক্ত থাকতে চাই না। সংসদেও এই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার সাথে আমরা সম্পৃক্ত হব না এবং এর প্রতিবাদ অব্যাহত রাখব’—বলেন জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র।



