বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসাথে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন সকালে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। ১৩তম দিনে সংসদের সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
অর্থমন্ত্রী বিবৃতিতে বলেন, কোন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের দায়িত্ব নেয়া হয়েছে এবং আগামীর যাত্রা কোথায় হবে সে সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির চালচিত্র
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে মহান সার্বভৌম সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বর্তমান মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে জনগণ মোট চারবার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে এ সুযোগ দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে। এ দায়বদ্ধতা থেকে আমি আজ এই মহান সংসদের মাধ্যমে আমাদের সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, সামাজিক খাতের সূচক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটা চিত্র দেশবাসীকে অবহিত করতে পারি। পাসাপাসি, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে একটি উন্নত, মর্যাদাশীল ও বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আমাদের প্রতিশ্রুতি দর্শন ও নীতি কৌশলের বিষয়েও দেশবাসীকে অবহিত করতে চাই।
ফ্যাসিস্ট সরকারের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির চিত্র
বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাৎ করা হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
প্রথমেই আমি বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র আপনার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চাই। উক্ত সময়কালে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশকিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে। আমি কিছু উপাত্ত আপনার মাধ্যমে মহান সংসদে তুলে ধরছি (বিস্তারিত উপাত্ত সংযুক্তি-১ হিসেবে উপস্থাপিত হবে)।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি
২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। পরবর্তীকালে অর্থনীতির আকার বাড়লেও দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্ত নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ তে পৌঁছায়। ২০০৫-০৬ সালে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ।
কর্মসংস্থান
একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু এই সময়ে কৃষিখাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতেই বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ছদ্ম-বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে এবং তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বর্তমানে কৃষিখাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের মাত্র ১১.৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। এই বৈপরীত্য কৃষিখাতে শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে ও শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে, এবং এটা কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি (job-less growth)-এর ঝুঁকিরই পরিচায়ক।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগ
২০০১-২০০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮.৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র উল্টে গেছে, বিনিয়োগ জিডিপির ৩০.৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় নেমে এসেছে ২৮.৪২ শতাংশে। বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস হতে সংস্থান করা হয়েছে। ফলে বহিঃখাতের উপর চাপ বেড়েছে।
টাকার বিনিময় হার
২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা হয়েছে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।
মুদ্রা সরবরাহ: ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ (গ২) প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৩ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩.৯ শতাংশ, যা অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭.৭ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৯ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ প্রবাহ
জুন ২০০৬-এ অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৫ শতাংশ, যা ২০২৫-এ নেমে এসেছে ৬.৭ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধিও ২১.১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপের বহিঃপ্রকাশ।
অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ
২০০৫-০৬ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩ শতাংশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সময়ে মুদ্রানীতির অব্যবস্থাপনাসহ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯.৮ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২৪-২৫ সালে আরও কমে ৬.৫ শতাংশে এসে পৌঁছেছে।
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা
রাজস্ব আদায়: বিগত সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায়ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি এবং রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮.২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যয় ছিল ১১.১ শতাংশ- ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ; ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪,০৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮.২ শতাংশেই স্থির থাকে। অন্যদিকে, ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪.০৫ শতাংশে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না।
শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলির সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষকোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনা: সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তুলনামূলক উচ্চ সুদের ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। একইসাথে ঋণ পরিশোধের দায়ও বৃদ্ধি পায়।
২০০৫-০৬ সালে মোট সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৩৭.৮ শতাংশ- যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৪.৫ শতাংশ ও ২৩.৩ শতাংশ। এ ছাড়া, সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা; অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ সালে মোট ঋণ জিডিপির অনুপাত প্রায় একই থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ২১.৫ ও ১৭.১ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপি’র শতাংশে কমলেও এই ঋণের একটা অংশ non-concessional বা অনেক ক্ষেত্রে Market Rate/Blended হওয়ায় দেশের Debt Sustainability এর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ১,১৪৭ বিলিয়ন টাকা অর্থাৎ ১৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ ঋণের উপর অধিক নির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন হয়েছে যাকে অর্থনীতির ভাষায় crowding out বলা হয়ে থাকে।
আমদানি-রফতানি, প্রবাস আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
২০০৫-০৬ সালে রফতানি ও আমদানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০.৫ বিলিয়ন ও ১৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে রফতানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১.৬ ও ১২.২ শতাংশ। এ ছাড়া, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪.৮ বিলিয়ন ও ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০২৩-২৪ সালে রফতানি ও আমদানি বেড়ে যথাক্রমে ৪০.৮ ও ৬৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও এই দু’টি সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এ ছাড়া, আমদানি ও রফতানির মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় রেমিট্যান্স বেড়ে ২৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ালেও হুন্ডি প্রবাহ বা অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রফতানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় (৩০.৩ বিলিয়ন ডলার), যা রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩.২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পরিমাণগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও গুণগত দিক থেকে ভারসাম্যহীনতা, নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত হয়েছিল, যা থেকে উত্তরণ আজকের সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সামাজিক সূচকগুলো এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
অর্থমন্ত্রী বিগত ১৬ বছরে আর্থ-সামাজিক সূচকগুলো এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মাথাপিছু আয়: মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকালে সংখ্যাটা প্রথমে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। মাথাপিছু আয়ের সংখ্যা নিয়েও বড় বিতর্ক আছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরীপ (HIES)-এর তথ্য অনুযায়ী, আয়-ভিত্তিক গিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালে ছিল ০.৪৬৭। ২০০৫ এর পর থেকে এই সূচকের ধারাবাহিক অবনতি হয়ে সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে পৌঁছায় ০.৪৯৯ পয়েন্টে।
২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ খানার আয় ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পাঁচ শতাংশ খানার ৩৫ গুণ; ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ গুণ। ফলশ্রুতিতে একটি বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজের উত্থান হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা প্রদান করা হলেও এর কাভারেজ ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকীকরণ করা হয়নি। এতে উপকারভোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে, যা ক্রমান্বয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে। এর মধ্যে আমি কয়েকটির কথা উল্লেখ করতে চাই।
প্রশাসনিক কাঠামো: প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ব্যুরোক্রেসি একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিগত ১৬ বছরে এটিকে দুর্বল করে দেয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান: বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অর্থনীতির ব্যাকবোন হিসেবে খ্যাত আর্থিক খাত ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি রেশিও (সিএআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পাল্টে গেছে- সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে।
এখানে উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে। মূলধন পর্যাপ্ততার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সিএআর ছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ৩.০৮ শতাংশে নেমে আসে। মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো এই ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়- এটি দীর্ঘ দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অনিবার্য পরিণতি।
রাজস্ব প্রশাসন: সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্তম্ভ হলো রাজস্ব আহরণ। অথচ দীর্ঘদিন রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে কর আহরণের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হয়নি।
তথ্য ব্যবস্থাপনা: একইভাবে, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য রফতানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।
সরবরাহ চেইন: বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি এমন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে বহিঃখাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একযোগে বিদ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকেই তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে দেশ পরিচালনা এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের।
বর্তমান সরকারের নিরঙ্কুশ বিজয় ও জনপ্রত্যাশা পূরণে গৃহীত/গৃহীতব্য কার্যক্রম
গত দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তার নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি ঘোষণা করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশ পরিচালনায় নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচিত হয়েই কালবিলম্ব না করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি।
জনগণকে দেয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিএনপির উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো তুলে ধরে আমির খসরু মাহমদু চৌধুরী বলেন, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রাথমিক ভাবে ৫০ লাখ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, যা ইতোমধ্যেই শুরু করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সকল পরিবারকে প্রদান করা হবে। প্রকৃত কৃষক, মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান, যার পাইলটিং ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ করা, যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ, সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy) খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও ইকো-ট্যুরিজম খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি; দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে এ খাতসমূহে ৫.০ লাখ কর্মসংস্থান সৃজন; আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে নতুন ব্র্যান্ড চালু; নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির আওতায় ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের বৃত্তি প্রদান; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী ও অটোমেশনের মাধ্যমে কর-জিডিপির অনুপাত মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীতকরণ; ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীতকরণ।
জনগণকে দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তর: বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণের (deregulation) মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, উন্নয়নের সুফল যাতে প্রতিটি নাগরিক ভোগ করতে পারে। পাশাপাশি, সৃজনশীল (creative) অর্থনীতি যেমন- art, culture, sports ইত্যাদিকে গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা। এ জন্য সরকারের উন্নয়নের অন্যতম স্লোগান হলো- ‘২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’, যা অর্জনে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নিরসন, সুশাসন নিশ্চিত করা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি তথা ADP গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বিধায় সরকার বর্তমান আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আগামী অর্থবছর হতে ADP-তে বরাদ্দ যৌক্তিক পরিমাণে বৃদ্ধি করতে এবং কৌশলগত উন্নয়ন দর্শনের সাথে সম্পদের বরাদ্দ সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহণে পরিকল্পনা কমিশনকে গুরুত্ব দিয়েছে। এর পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলোকে পর্যালোচনা করে জনগুরুত্বহীন, বহুদিন ধরে চলমান ও অর্থায়ন-বিবর্জিত ‘yombie’ প্রকল্প চিহ্নিত করে বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই-এর গুণমান বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নকাল মেনে চলা ও বাস্তবায়নের হার পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমাদের সরকারের এক্ষেত্রে একটি অনুসৃত সামাজিক চুক্তির (social contract) প্রতিপাদ্য হলো- রাজস্ব আদায়ে আনতে হবে স্বচ্ছতা, সরকারি ব্যয়ের সুবিধাসমূহ (benefits) হবে দৃশ্যমান এবং নীতি হবে সামনে এগিয়ে চলার। এর মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে উন্নয়ন অর্থায়ন করে ঋণ নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং জনগণকে তার প্রদেয় করের বিনিময়ে সুশাসন, নিরাপদ ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জনবান্ধব করার মাধ্যমে জনগণকে কর প্রদানে উৎসাহিত করে ক্রমান্বয়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০৩৪ সালে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
আমির খসরু মাহমদু চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব প্রদান করছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত হতে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপি’র উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক Macro-Fiscal Model উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপন করে সে অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পরপরই লক্ষ করেছি যে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি পূরণে শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো:
১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজতর হয়।
২. রাজস্ব সংস্কার: আমরা করজাল বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করছি যাতে ঋণের নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ অর্জিত হয়।
৩. পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা: আমরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করেছি।
৪. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: আমরা এসএমই (SME) খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছি যা প্রকৃত জিডিপি বাড়াবে এবং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি করা হবে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঋণ প্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সহনীয় হারে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে।
৫. সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার দক্ষ সম্প্রসারণ।
মাননীয় স্পিকার, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা বাস্তবায়নে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেয়া হচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়া হবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি কর্পোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজম্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং আমাদের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
এখানে একটি বাস্তবতার কথা মহান সংসদের মাধ্যমে জনসাধারণকে জানানো প্রয়োজন। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দশ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছে যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে সরকারকে চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এলএনজি-তে নির্ধারিত ভর্তুকির অতিরিক্ত আরো প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা প্রদান করতে হবে। এটি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়াবে অন্যদিকে সমপরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব ফেলবে। সরকার এ অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস আদালত ৫টার পরিবর্তে ৪ বন্ধ করা। ডেলাইট ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক লাইট ব্যবহার কমানো ও এসি’র তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। মার্কেট-সুপারমলগুলো সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা। বিকল্প উৎস হতে জ্বালানি সংগ্রহ করে জ্বালানির নিরাপত্তা মজুদ নিশ্চিত করা। ভর্তুকির অর্থ যথাসময়ে ছাড়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি ক্রয় ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। বাজেটে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সহনীয় রাখতে উন্নয়ন সহযোগিদের কাছে অতিরিক্ত বাজেট সাপোর্ট পেতে উদ্যোগ গ্রহণ। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সরকারের অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদানের প্রয়োজন হলেও জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে সরকার আপাততঃ মূল্য সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যেই আমাদের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং আমরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের কাছে জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা সে সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন। অন্যদিকে, জনগণও উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমাদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখবেন এটাও আমরা আশা করি। আমাদের এবারের লক্ষ্য কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
আমির খসরু বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জনমানুষের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। অতঃপর আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের বিস্তৃতি এবং মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথপরিক্রমার সূচনা করেছিলেন। ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন, শুল্ক ও আমদানি কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে তিনি অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার ধারণ করে আমরা আজ আবার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি প্রাগ্রসর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই পথে পরিচালিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এবং আমরা এটা করতে চাই স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার ওপর নির্ভর করে। জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রেখে আমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন। সেই আস্থার প্রতিদান দেয়াই হবে এই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সকালের সেশনে ১০টি বিল পাস
সকালের সেশনে মোট ১০টি বিল পাস হয়েছে। এগুলো হলো- নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী (সংশোধন) বিল-২০২৬, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল-২০২৬, আমানত সুরক্ষা বিল-২০২৬, এক্সসাইজ অ্যান্ড সল্ট অ্যাক্ট এবং মূল্যসংযোজন কর ও সম্পূরক মূল্য আইন (সংশোধন) ২০২৬ বিল পাস হয়।



