দেশের তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়ছেন। মালিকদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি এ খাত থেকে ছিটকে পড়বেন বলে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়ের নিচে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় হাজার হাজার খামারি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে দেশের ৬৪ হাজার পোল্ট্রি খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
তারা বলেন, এমতাবস্থায় দেশের অন্যতম প্রধান প্রাণিজ প্রোটিন খাতটি কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে ডিম ও মুরগির দামে, একইসাথে ঝুঁকিতে পড়বে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান।
শনিবার (১১ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন বিপিআইএ’র সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। এর আগে সংগঠনের উদ্যোগে সারাদেশের পোল্ট্রি খামারিদের ১১ দফা দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সিদ্ধ ডিম বিতরণ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএর উপদেষ্টা এনসি বনিক, সহসভাপতি মেজবাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রচার সম্পাদক সফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক গাজী নূর হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুন্না মুন্সীসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির হিসাব
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১০ টাকা ২০ পয়সা থেকে সাড়ে ১০ টাকা। অথচ প্রান্তিক খামারিরা পাইকারি পর্যায়ে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ছয় থেকে সাড়ে ছয় টাকায়। ফলে প্রতিটি ডিমে প্রায় চার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিপিআইএর হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ছয় কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। সেই হিসাবে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ কোটি টাকা। মাসজুড়ে এ ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে প্রায় ৫০০ কোটিতে পৌঁছায় বলে দাবি সংগঠনটির।
পাঁচ বছরে ঝরে পড়েছেন ৬৪ হাজার খামারি
লিখিত বক্তব্যে মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়ের নিচে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় হাজার হাজার খামারি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে দেশের ৬৪ হাজার পোল্ট্রি খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন। তিনি বলেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
‘ফেয়ার প্রাইস’ নির্ধারণের দাবি
পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় যৌক্তিক বা ‘ফেয়ার প্রাইস’ নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বিপিআইএ সভাপতি বলেন, এমন মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন। তার ভাষ্য, মাছ, মুরগির বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় হয়নি। ফলে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়েছেন প্রান্তিক উৎপাদকরা।
ডিজিটাল ডাটাবেজ ও ফার্মার আইডি চালুর আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে সারাদেশের নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারিদের নিয়ে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালুর দাবি জানানো হয়। বিপিআইএর মতে, ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে, খামারি ঝরে পড়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে নজরদারির আওতায় আনা যাবে। একইসাথে সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া সহজ হবে।
খাদ্য ব্যয়ই সবচেয়ে বড় চাপ
বিপিআইএর মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, একজন খামারির মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে চার শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল রয়েছে, যা প্রত্যাহারের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে সংগঠনটি। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষি উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর এ ধরনের কর নেই। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও খাতটির উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠনের প্রস্তাব
সংগঠনটির দাবি, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খামারি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী বাংলাদেশ জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম গঠন করতে হবে। একইসাথে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য পোল্ট্রি-ঘন এলাকায় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি, পোল্ট্রি বীমা চালু এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার থেকে সাড়ে ছয় টাকার মধ্যে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন ভোক্তাদের ১০ থেকে সাড়ে ১০ টাকা দিয়ে ডিম কিনতে হয়। তার অভিযোগ, ডিম পচনশীল হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করতে পারেন না। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার দাবি
বিপিআইএ নেতারা বলেন, পোল্ট্রি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।



