পুশইনের প্রতিটি ঘটনায় যে ‘প্যাটার্ন’ ব্যবহার করছে বিএসএফ

বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বারবার পতাকা বৈঠক, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনা তো ঘটছেই, এমনকি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ মিলে বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গত ৪ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক
গত ৪ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক |সংগৃহীত

‘তাদের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বরাবর সীমান্ত সড়ক রয়েছে এবং কাঁটাতারের বেড়ার বিভিন্ন জায়গায় গেট রয়েছে। সীমান্ত সড়ক দিয়ে রাতে বড় গাড়িতে করে মানুষ নিয়ে গিয়ে, লাইট বন্ধ করে, কোনো একটি গেট খুলে দিয়ে মানুষ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয় তারা।’

ভারতের সীমান্তের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের দিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কিভাবে ঠেলে দিচ্ছে, সেটির ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিজিবি’র দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান।

সীমান্ত এলাকায় গত বেশ কিছুদিন ধরেই ‘পুশইন’ বা ‘পুশ ব্যাক’ নিয়ে উত্তেজনা চলছে। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বারবার পতাকা বৈঠক, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনা তো ঘটছেই, এমনকি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ মিলে বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া করেছে – এমন ঘটনাও একাধিকবার ঘটেছে।

গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মে মাসের শেষদিক থেকে জুনের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্টে অন্তত ২০০ জন মানুষকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

তারা বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের বাহিনীর সদস্যদের সাথে স্থানীয় মানুষ একজোট হয়ে বাধা দেয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি কেউ।

বিজিবির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি জেলার ক্ষেত্রেই বিএসএফের এই পুশইন করার ‘প্যাটার্ন’ বা ঘটনাপ্রবাহ একইরকম।

‘প্রতিটি পুশইনের আগেই ওই এলাকায় ভারতের সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়, এটি সবচেয়ে বড় সিগন্যাল,’ বলেন মাহমুদুল হাসান।

এ ধরনের বিষয়গুলো স্থানীয়দের জানিয়ে ‘পুশইন’ ঠেকাতে তাদের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সীমান্তে যেমন পরিস্থিতি দেখা গেলো

যশোরের বেনাপোল অঞ্চলে ভারতের সীমান্তের একেবারে লাগোয়া গ্রাম সাদিপুর থেকে আরেক সীমান্তবর্তী গ্রাম রঘুনাথপুরের দিকে যাওয়ার রাস্তাটাও বাংলাদেশের সীমান্তের ঠিক সাথেই।

২ জুন বিকেলের দিকে গাছের ছায়ায় ঢাকা ওই রাস্তায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকাটা যেন এক ধরনের ‘ট্যুরিস্ট স্পটে’ পরিণত হয়েছে। কারণ আশেপাশের কয়েকগ্রাম থেকে স্থানীয় মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়া মানুষ – যারা দুই দেশের মধ্যবর্তী অঞ্চল বা ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে’ আটকে পড়েছে – তারা কিভাবে রয়েছে তা দেখতে।

যদিও দুই দেশের মধ্যবর্তী এলাকা, যেটিকে সাধারণভাবে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ বলা হয়ে থাকে, সেখানে কোনো মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছিল না।

জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র গরমের মধ্যে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি তখন সম্ভবত ভারতের সীমানার কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নো ম্যান্স ল্যান্ডে পড়ে ছিল তাদের কিছু কাপড়, ব্যাগের মতো ব্যবহার্য জিনিসপত্র।

বিজিবি’র অভিযোগ, এই ১০-১২ জনের দলটিকে ৩১ মে মধ্যরাতে ভারতের সীমানার কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয় বিএসএফ। সেসময় বিজিবি সদস্যরা মাইকিং করে, টর্চ লাইট জ্বালিয়ে তাদের বাংলাদেশের দিকে প্রবেশ করতে বাধা দিলে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে পড়েন তারা।

এর কয়েকদিন পর, জুনের ৭ তারিখ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে গিয়েও অনেকটা একই রকম পরিস্থিতি দেখা যায়। ওই সীমান্ত দিয়ে ২৮ জনকে ৩ জুন ভোররাতে বাংলাদেশের দিকে ‘পুশইন’ করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলে বিজিবি।

৩ জুন ভোররাতে, রাত প্রায় দুইটা-আড়াইটার দিকে, বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত চৌকির বিজিবি সদস্যরা এবং স্থানীয় ২০-৩০ জন নারী-পুরুষ মিলে ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশের দিকে ঢুকে যাওয়া থেকে বাধা দেন এবং তাদের ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ অঞ্চলে থাকতে বাধ্য করেন।

ওই সীমান্ত পয়েন্টে ২৮ জন ব্যক্তি আটকা পড়ে ছিলেন দু’দিন ধরে। ৬ জুন রাত থেকে তাদের ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ অঞ্চলে আর দেখা যায়নি।

ওই অঞ্চলের বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সেখানকার বিএসএফ কর্মকর্তাদের সাথে কয়েকদফা আলোচনার পর ছয়ই জুন রাতে লাইট বন্ধ করে আটকে পড়া ব্যক্তিদের ভারতের সীমান্তের ভেতরে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। যদিও বিএসএফ এই বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

যেভাবে বিএসএফ ‘পুশইন’ করে

মে মাসের শেষদিকে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলা সংলগ্ন সীমান্তের ভারত অংশে কয়েক শ’ মানুষ জড়ো হওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সব অঞ্চলেই নজরদারি বাড়ায় বিজিবি।

আর তার পর থেকেই ঝিনাইদহ, যশোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলার সীমান্তে এই ‘পুশইন’ করা মানুষ থামাতে থাকে তারা।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএসএফের এই পুশইন করার 'প্যাটার্ন' বা ঘটনাপ্রবাহটা প্রায় একই ধরনের- বলছিলেন বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান।

বিজিবির নিজেদের নজরদারি, সামরিক ও বেসামরিক সূত্র আর গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, কোনো সীমান্ত দিয়ে মানুষ প্রবেশ করানোর আগে বিএসএফের কিছু কাজ ‘সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসানের দাবি, সীমান্তের কাছের গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষ এই নজরদারি আর টহলের কাজে বিজিবিকে সহায়তা না করলে ‘পুশইন’ ঠেকানো সম্ভব হতো না বিজিবির পক্ষে।

স্থানীয় মানুষ যেভাবে বিজিবিকে সহায়তা করছে

মে মাসের শেষদিকে যখন সাতক্ষীরার কলারোয়া অঞ্চলের সীমান্তের ভারতের দিকের অংশে মানুষ জড়ো করা হয়, তখন থেকেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অন্যান্য সীমানা এলাকাতেও কার্যক্রম জোরদার করে বিজিবি। এর একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল স্থানীয়দের বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট করা।

‘স্থানীয় স্কুলে, মসজিদে, এলাকার বাজারে গিয়ে আমরা নিয়মিত মাইকিং করতে থাকি এবং স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে তাদের জানাই যেকোনো ধরনের লক্ষণ দেখলে বুঝবেন যে পুশইন হতে পারে,’ বলেন বিজিবির নওগাঁ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম মাসুম।

তিনি বলেন, এর ফলও পাওয়া যায় কয়েকদিনের মধ্যেই।

‘বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ৩ জুন মধ্যরাতে যে লাইট বন্ধ হয়েছে এবং কিছু মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, এই খবর আমরা প্রথম পাই সেখানকার বাজারের একজন চৌকিদারের কাছ থেকে।’

এই চৌকিদার আমিনউল্লাহ বলেন, বিজিবি কয়েকদিন আগে থেকে তাকে সীমান্তের লাইট বন্ধ হওয়া বা রাতে সীমান্তের ওপারে গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনলে সতর্ক থাকার জন্য বলে।

শুধু তাই নয়, সীমান্তের কয়েক শ’ মিটারের মধ্যে বাড়ি হওয়ায় ৩ জুন রাতে ভারত অংশ থেকে আসা ২৮ জনকে বাধা দেয়ার জন্য সবার আগে এগিয়ে যায় তার পরিবারের সদস্যরা, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও ছিলেন।

আমিনউল্লাহর বোন বলেন, ‘রাত আড়াইটার দিকে উঠে দেখলাম বেশ কয়েকজন পুরুষ আর নারী আমাদের (সীমান্তের) দিকে ঢুকতে চাইছে। বিজিবি পুরুষদের আটকালেও নারীদের গায়ে হাত দিয়ে আটকাতে পারছিল না। তখন আমরা কয়েকজন ওদের মহিলাদের আটকাই আর ভারতের দিকে ঠেলে দেই।’

শুধু বাঙ্গাবাড়ী নয়, আরো বেশ কয়েকটি সীমান্ত অঞ্চলে এসব ‘পুশইনের’ ঘটনা ঠেকাতে স্থানীয় মানুষদের ভূমিকার কথা সামনে এসেছে।

জুনের প্রথমদিকে লালমনিরহাটে বিএসএফ সদস্যদের দিকে একদল গ্রামবাসীর তেড়ে যাওয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা তৈরি করে।

এরপর ১০ জুন জামালপুরের একটি সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ড অঞ্চলে বিজিবি-বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে কথা কাটাকাটির ঘটনার পর আবারো স্থানীয় মানুষজন বিএসএফ সদস্যদের অনেকটা ‘ধাওয়া’ দিয়ে ভারতের সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

এছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাতেই স্থানীয় গ্রামবাসী রাত জেগে বিজিবির সাথে পাহাড়া আর টহলে অংশ নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।

বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণ মানুষ টহল না দিলেও অনেক সময় বিপুল সংখ্যায় তাদের উপস্থিতিই কার্যকর হয়। বহু মানুষের উপস্থিতিতে বিএসএফ সাধারণত ‘পুশইন’ থেকে বিরত থাকে বলে বলেন বিজিবি কর্মকর্তারা।

যশোর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষদের সাথে কথা বলে বোঝা যায় যে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষদের জন্য তাদের সহানুভূতি কোনো অংশে কম নয়। আটকেপড়া মানুষের একটা বড় অংশ বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়েও তাদের মনোভাব ইতিবাচকই।

কিন্তু বিজিবির মতো তাদেরও একটাই চাওয়া, এই ফিরিয়ে দেয়া-নেয়ার প্রক্রিয়াটা যেন ‘পুশইন’, ‘পুশ-ব্যাকের’ মাধ্যমে না হয়ে আইনসঙ্গত পদ্ধতিতে হয়।

বিএসএফ কী বলছে?

বিজিবির অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি বিএসএফ। তবে বিজিবির সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের বৈঠকে তারা একাধিকবার এই পুশইনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে বলেন বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

‘বিএসএফের ব্যাখ্যা- তারা এই পুশইনের সাথে জড়িত না এবং তারা জানে না এই মানুষজন জিরো লাইনের এপারে কিভাবো এলো। তারা মনে করে, যারা নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকা পড়েছে তারা বাংলাদেশের নাগরিক,’ বিজিবির অভিযোগ সম্পর্কে বিএসএফ কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তর এভাবেই দেন বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান।

সূত্র : বিবিসি