ঘুষিতে আহত সেই কৃষি কর্মকর্তাকেই তাৎক্ষণিক বদলি

ডিএই’র ডিজিকে লাঞ্চিত করার অভিযোগ কৃষি গবেষণা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

ভুক্তভোগীকে এই কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক কর্মস্থল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার তদন্ত হয়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক
আহত বনি আমিন খান
আহত বনি আমিন খান |নয়া দিগন্ত

রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে জুনিয়র কর্মকর্তার ঘুষিতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত বদলির আদেশ পেলেন হামলার শিকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা বনি আমিন খান। ভুক্তভোগীকে এই কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক কর্মস্থল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার তদন্ত হয়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তা এম মাসুম বিল্লাহকে বদলি করা হয়েছে।

গত সোমবার রাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় আহত হন ২৯তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং) বনি আমিন খান। ৩১তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা ডিএইয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (প্রশাসন-২) এ এম মাসুম বিল্লাহ তাকে ঘুষি মেরে আহত করেন বলে অভিযোগ। এ নিয়ে মঙ্গলবার নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। মঙ্গলবার বনি আমিন খান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে বিচার দাবি করেন।

ডিএই ও খামারবাড়ি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অভিযোগ জমা দেওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ এম মাসুম বিল্লাহর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা হামলার ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার পাশাপাশি আহত কর্মকর্তা বনি আমিন খানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। এর একদিনের মাথায় বুধবার কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দুই কর্মকর্তাকেই বদলি করে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এ এম মাসুম বিল্লাহকে সুনামগঞ্জে উপপরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে বনি আমিন খানের আগের বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে নড়াইলের উপপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।দুই কর্মকর্তাকেই একই দিনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তাৎক্ষণিক অবমুক্ত বলে গণ্য করার কথা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

ডিএইয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলার শিকার একজন কর্মকর্তাকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বদলি করা নজিরবিহীন। এতে কর্মকর্তাদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে মারধরের পরও তদন্ত বা শাস্তির পরিবর্তে তাকেও বদলি করায় প্রশাসনের ভেতরে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, একজন জুনিয়র কর্মকর্তা সিনিয়র কর্মকর্তার ওপর হাত তুলেছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, প্রশাসনিক শৃঙ্খলারও বিষয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা না হলে মাঠপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাত পৌনে ৮টার দিকে কেআইবি চত্বরে বনি আমিন খান ও এ এম মাসুম বিল্লাহর মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা বাগ্‌বিতণ্ডায় রূপ নিলে মাসুম বিল্লাহ বনি আমিন খানের মুখে একাধিক ঘুষি মারেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরে কৃষি ক্যাডারের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কেআইবির সদস্যরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে বনি আমিন খানের মুখমণ্ডল ফুলে যায় এবং বাম চোখের নিচে আঘাত লেগে রক্তপাত হয়। পরে তাকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ এম মাসুম বিল্লাহ ওই দিন রাতেই নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা।ঘটনার পরপরই সেখানে উপস্থিত অ্যাব নেতাদের সামনে আমি স্যারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি এবং ক্ষমা চেয়েছি।

বনি আমিন খান বলেন, কেআইবি চত্বরে আমি হামলার শিকার হয়েছি। বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানিয়েছি এবং বিচার চেয়ে লিখিত আবেদন করেছি। আমি চাই ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হোক।”

এ বিষয়ে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, আমরা দুজনকেই বদলি করেছি। ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করা হবে।

খামারবাড়িকেন্দ্রিক একাধিক সূত্র জানায়, বনি আমিন খান ও এ এম মাসুম বিল্লাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।

এদিকে, বুধবার দুপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আব্দুর রহিমকে লাঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের বার্ষিক কারিগরি কর্মশালা শেষে গাড়িতে ওঠার পূর্ব মুহূর্তে তাকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বারি) খাগড়াছড়ির রামগড় অবস্থিত পাহাড় অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে ডিজিকে লাঞ্চিত করার এ অভিযোগ উঠেছে। ডিএই’র অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (প্রশাসন-২) এ এম মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি চাপ দেন বলে অভিযোগ। এ সময় তার সাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বনি আমিন খানসহ ডিএই ও ছিলেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়।দেশীয় সংবাদ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এমদাদুল হক ডিএই’র ডিজি আব্দুর রহিমকে উচ্চ স্বরে হুমকি ধামকি দিতে থাকেন। মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটে একটি কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রধান অতিথি ছিলেন। এসময় তিনি বিব্রত হয়ে দ্রুত অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করেন। পরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম কোন কথার জবাব না দিয়ে অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, বারি’র কর্মকর্তা এমদাদুল হকের কর্মস্থল খাগড়াছড়িতে হলেও তাকে বেশিরভাগ সময়ই রাজধানীর খামারবাড়ি ও কেআইবিতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে কিছু সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম নয়া দিগন্তকে জানান, ঠিক লাঞ্ছনা নয়। তবে ওর আচরণ অশোভন ছিল এবং অনধিকার চর্চা মনে করতে পারেন।