বিচারের মুখে ‘গুম জিয়াউল’

‘গেস্টাপো’ স্টাইলে মানুষ হত্যা : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গা শিউরে ওঠা অভিযোগ

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে র‌্যাব ও এনটিএমসি ব্যবহার করে একটি ভয়ঙ্কর ‘কিলিং মেশিন’ গড়ে তোলার অভিযোগে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
আদালত প্রাঙ্গণে জিয়াউল আহসান
আদালত প্রাঙ্গণে জিয়াউল আহসান |নয়া দিগন্ত

আওয়ামী লীগ শাসনামলের টানা ১৫ বছরে বাংলাদেশে যে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, তার অন্যতম কারিগর ও ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে র‌্যাব ও এনটিএমসি ব্যবহার করে একটি ভয়ঙ্কর ‘কিলিং মেশিন’ গড়ে তোলার অভিযোগে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

গতকাল বুধবার জিয়াউল আহসানের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। একই সাথে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়।

বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী যখন এজলাসে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা ১০৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রের সারসংক্ষেপ পাঠ করছিলেন, তখন পুরো আদালতকক্ষে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। অভিযোগে বলা হয়, কেবল ক্ষমতার গদি অটুট রাখতে তিনি পরিকল্পিতভাবে গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত করেছিলেন।

আদালতে উভয় পক্ষ : ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, শাইখ মাহদীসহ অন্যরা। আসামি পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন নাহার।

এ দিন সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রিজনভ্যানে জিয়াউল আহসানকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তিনি বর্তমানে একাধিক মামলায় কারাবন্দী। উল্লেখ্য, গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয়। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

যেভাবে চলত ‘ডেথ স্কোয়াড’

অধ্যায় ১ : ঢাকার বাইপাস হত্যা অভিযান : ২০০৯-২০১১ সালের মধ্যে, ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতের আনুমানিক ১১.৩০ মিনিটে গাজীপুর জেলার পুবাইল এলাকায় র‌্যাব সদর দফতরের তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জিয়াউল আহসান তার বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের সাথে গাড়িবহরে এগিয়ে যান।

ভিকটিমদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামানো হয় এবং প্রত্যক্ষভাবে জিয়াউল আহসানের হাতে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। লাশগুলো রাস্তার পাশে বা খালের মতো গর্তে ফেলে দেয়া হয়।

পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, ওই অভিযানে একজনকে শনাক্ত করা গেছে, অন্যদের অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ড ঢাকার বাইপাসের পথ ধরে একটি পরিকল্পিত হত্যা নেটওয়ার্কের শুরুর সঙ্কেত দেয়।

অধ্যায় ২ : বরগুনা নদীতে ‘গেস্টাপো’ অভিযান : বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থানার চরদোয়ানী এলাকার বলেশ্বর নদী ও মোহনায় ৫০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। রাতের অন্ধকারে র‌্যাব কালো গাড়িবহর ও ট্রলার ব্যবহার করে নিরীহ মানুষদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় আটক করে নদীতে নিয়ে যায়।

ট্রলারে ভিকটিমদের শরীরের সাথে বালিশ ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। পরে পেট ফুঁড়ে, সিমেন্টের ব্লক বেঁধে নদীতে ফেলা হয়। হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন ট্রলারের ডেকে পানি দিয়ে মুছে ফেলা হয়।

স্থানীয়রা এটিকে ‘ডুবানো’ নামে চেনে, কিন্তু আসলে এটি ছিল মানবতাবিরোধী হত্যার একটি সুপরিকল্পিত অংশ। এই ধরনের অভিযান ঢাকার শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদী, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী, এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলেও পরিচালিত হয়।

অধ্যায় ৩ : নজরুল ইসলাম মল্লিক হত্যাকাণ্ড : সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর আত্মগোপনে ছিলেন। ২০১০ সালের ১৫ মার্চ র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল তাকে আটক করে গোপন স্থানে নিয়ে যায়।

মধ্য-নদীতে ট্রলার ব্যবহার করে নজরুলসহ চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। লাশের সাথে সিমেন্টের ব্লক বাঁধা হয় এবং নদীতে ফেলা হয়। পরে ১৭ মে ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় লাশটি নজরুল ইসলাম মল্লিকের বলে নিশ্চিত হয়।

অধ্যায় ৪ : আলকাছ মল্লিক গুম : আলকাছ মল্লিক, চরদোয়ানী এলাকার একজন ট্রলার মালিক, র‌্যাবের অভিযানে তার ট্রলার সরবরাহ করতেন। নিরীহ মানুষদের হত্যা দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং স্থানীয়দের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে শুরু করেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জিয়াউল আহসান ২০১১ সালের জুনে আলকাছকে ডেকে নিয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যদের মতে, আলকাছকেও নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

অধ্যায় ৫ : সুন্দরবন ও কটকা অভিযান : অপারেশন নিশানখালী: ২০১১ সালের ১২ নভেম্বর, খুলনার দাকোপ থানাধীন সুন্দরবনের নিশানখালী এলাকায় বনদস্যু দমনের নামে অভিযান পরিচালিত হয়। দুই বন্দীকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে স্থানীয় পুলিশ ও মিডিয়াকে উপস্থিত রাখা হয়।

অপারেশন মরা ভোলা : ২০১২ সালের ১৬ মার্চ, সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশের মরা ভোলা খালে পাঁচ বন্দীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভিকটিমদের হত্যা দেখানোর জন্য র‌্যাব হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয় এবং মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়।

অপারেশন কটকা : ২০১২ সালের ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি কটকা অঞ্চলে আটজনকে হত্যা করা হয়। ট্রলারে ভিকটিমদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় নদীতে নিয়ে গিয়ে গুলি করা হয়। তাদের লাশ নদীতে ফেলা হয় এবং হত্যাকাণ্ডকে ক্রসফায়ার নাটক আড়াল করে চালানো হয়।

অধ্যায় ৬ : জিয়াউল আহসানের নেটওয়ার্ক : ২০০৯-২০১৬ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসান র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ও এডিজি (অপস) হিসেবে অসংখ্য গুম ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

তার বিশ্বস্ত র‌্যাব সদস্যরা পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড সংঘটন করত। বিএনপি নেতারা, ছাত্রশিবির কর্মী, হেফাজতের বিক্ষোভকারী এবং অন্যান্য নিরীহ মানুষ এই অভিযানের শিকার হন। হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য ছিল ভিন্নমত দমন ও শাসন কাঠামোকে শক্তিশালী করা।

এখানে দেখা যায়, কিভাবে জিয়াউল আহসান এবং তার নেতৃত্বাধীন র‌্যাবের গোয়েন্দা দল একটি সুপরিকল্পিত হত্যার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। এটি ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ, যেখানে ভিকটিমরা ছিলেন অসহায়, নিরীহ মানুষ। হত্যার ছদ্মনাটক, ট্রলার ও নদী ব্যবহার এবং মিডিয়ার উপস্থিতি সবই এই নেটওয়ার্ককে আড়াল করার জন্য পরিকল্পিত ছিল।

‘বিনা কমান্ডে জেনারেল’ : তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে র‌্যাবে পোস্টিং পাওয়ার পর জিয়াউল আহসান আর কখনো সেনাবাহিনীতে ফিরে যাননি। কোনো ব্যাটালিয়ন বা ব্রিগেড কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি একের পর এক পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে বিরল। অভিযোগে বলা হয়, তিনি তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর একচ্ছত্র আজ্ঞাবহ ‘স্পেশাল অপারেটর’ হিসেবে কাজ করতেন।

ডিজিটাল নজরদারি ও শাপলা চত্বর : জিয়াউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেবল গুম ও খুনেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এনটিএমসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নাগরিকদের ফোনকল রেকর্ড ও ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে ভিন্ন মতালম্বীদের শনাক্ত করে গুম করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অন্তত ৬১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় তার সরাসরি নেতৃত্ব ও ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। বুধবার সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন সম্পন্ন করেন। এ সময় আদালত জিয়াউল আহসানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিষ্পৃহ কণ্ঠে বলেন, “আমি দোষী নই।”

এই ঐতিহাসিক মামলায় আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশন তাদের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করবে। সেদিন ভিডিও ফুটেজ, নথিপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমের মূল পর্ব শুরু হবে।

টিএফআই সেল পরিদর্শনের অনুমতি : এ দিকে আরেক গুম-নির্যাতন মামলায় ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখিত র‌্যাবের টিএফআই সেল পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আসামিপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তাবারক হোসেন, যিনি গুমের একটি মামলায় সাত আসামির পক্ষে লড়ছেন। তিনি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি চান। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করেন।

পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে তাবারক হোসেন বলেন, প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জে র‌্যাবের টিএফআই সেলকে অপরাধের ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই সেখানে পরিদর্শনের আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল আমাদের আবেদন গ্রহণ করেছেন। প্রসিকিউশন চাইলে আমাদের সাথে যেতে পারবে। তিনি আরো জানান, আসামি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলমের জামিন আবেদন- তিনি হার্টের রোগী- ট্রাইব্যুনাল রেকর্ডে রেখেছেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, টিএফআই সেল পরিদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়েছে শর্তসাপেক্ষে। প্রসিকিউশনকে জানিয়ে সেখানে যেতে হবে এবং চাইলে রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থিত থাকতে পারবে।