আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৫ মাসে ৪ রায়ে ১৩ মৃত্যুদণ্ড, ১০ জনের যাবজ্জীবন

আলোচিত চারটি রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল |সংগৃহীত

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত পাঁচ মাসে চারটি রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

আলোচিত চারটি রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

প্রথম রায়ে হাসিনা-কামালের মৃত্যুদণ্ড : চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সেইসাথে বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় আসামি থেকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। ঐতিহাসিক এ রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশের পাশাপাশি শহীদদের পরিবারকে এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

দ্বিতীয় রায়ে তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড : চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলেন— সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো: আখতারুল ইসলাম। এছাড়া, এ রায়ে পলাতক আসামি সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড, শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো: আরশেদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড, কনস্টেবল মো: সুজন মিয়া, মো: ইমাজ হোসেন ইমন ও মো: নাসিরুল ইসলামকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো: ইয়াকুব, মো: রাকিব হাওলাদার, মো: ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।

লাশ পোড়ানোর মামলায় তৃতীয় রায় : চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ অপর একজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সেইসাথে আরো সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন— ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এ এফ এম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া। এ রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো: আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো: আরাফাত হোসেন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস ও সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। এছাড়া, এ রায়ে সাত বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন— সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসান। এ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় চতুর্থ রায় : চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে এই মামলার অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়।

২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সর্বসম্মতিক্রমে দেয়া রায়ে সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো: আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল আসামি সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আর সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ (বেরোবি) এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবি’র সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ ও বেরোবি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবি’র সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবি’র অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) রংপুরের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, বেরোবি’র সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলামকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, বেরোবি’র সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, বেরোবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, বেরোবি ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবি’র এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, বেরোবি’র সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া ও বেরোবি’র এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমুকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাস সময়কেই কারাবাস হিসেবে রায় দেয়া হয়।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেয়া আবু সাঈদের সেই ভিডিও দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের গুম-খুনসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এখন দু’টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। সূত্র : বাসস