রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার পদটিকে মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে চান বলে উল্লেখ করেছেন দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল)।
তিনি বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার পদ। এই পদের দায়িত্ব ও গুরুত্ব অনেক। অ্যাটর্নি জেনারেল দেশের সব আদালতেই তার বক্তব্য পেশ করতে পারেন। মূলত সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনাই হচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেলের মূল কাজ।’
শনিবার (২৮ মার্চ) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাথে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন।
মানুষের জন্য সুবিচার নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এই দেশটা আমাদের সবার। আমরা দেশের মঙ্গল চাই। একটা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সুবিচার প্রাপ্তি যেন সুনিশ্চিত হয়, সেক্ষেত্রে আমার চেষ্টা থাকবে সবার আগে। অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটিকে আমি মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে চাই।’
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন হবে কি না? এবিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস হবে কি হবে না, এটা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। সরকার যদি মনে করে যে, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস করা দরকার সেক্ষেত্রে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেই পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় বিচার প্রার্থী বান্ধব হবে কি না? সে প্রশ্নে ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আদালতে দু-পক্ষেই আইনজীবী থাকেন। আর রাষ্ট্রের পক্ষে তো অবশ্যই একজন আইনজীবী থাকবেন। তবে অহেতুক কোনো বিড়ম্বনা সৃষ্টি না করাটা হবে আমাদের (রাষ্ট্র পক্ষের) অন্যতম লক্ষ্য। আর যেকোনো আইনি বিষয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। তবে রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো বিষয় থাকলে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে রিপ্রেজেন্ট করা হবে আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ও কাজ।
অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের আইন কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার কাজল বলেন, এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের দুই একজন ল’ অফিসারের সম্পর্কে অভিযোগ আমরা পেয়েছি ও শুনেছি। হয়তো সে সব অভিযোগের অনেকগুলোর সত্যতাও আছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্রেডিবল ইনফরমেশন আছে সেগুলো দেখা হবে। তবে বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে অনেক ভালো ভালো আইন কর্মকর্তা আছেন যাদের পারফরমেন্স সম্পর্কে আমার ধারণা আছে।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আমাদের বর্তমান আইনমন্ত্রী এখানে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটা টাইমে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওনার যে অভিজ্ঞতা সেগুলো আমার কাজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর যে কাজগুলো করলে বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রত্যাশা পূরণ সহজ হবে সে বিষয়গুলো নিয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে কথা বলব। সর্বোপরি রাষ্ট্রের পক্ষে অ্যাটর্নি সার্ভিস যেমনটি হওয়া উচিত সেভাবেই আমার তা গড়ে তোলার চেষ্টা থাকবে বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
পদাধিকার বলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হওয়ায় আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সম্পর্কে পরিকল্পনা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘একজন আইন শিক্ষার্থীর অন্যতম স্বপ্ন থাকে যে কতো দ্রুত তিনি আইনজীবী হবেন। দ্রুততম সময়ে সে প্রত্যাশা পূরণ করাটা বার কাউন্সিলের দায়িত্ব। অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ায় আমার ওপর যেহেতু দায়িত্ব এসেছে, তাই আমার এখন দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। এরআগে বার কাউন্সিলের যে সিদ্ধান্ত ছিল নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণের, সেটা এখন থেকে সঠিকভাবে করা হবে। আমি আইন শিক্ষার্থীদেরকে এতটুকু আশ্বস্ত করতে চাই যে, পরীক্ষা সংক্রান্ত কোন ধরনের জটিলতা, বিলম্ব কিংবা দীর্ঘসূত্রিতা ইনশাআল্লাহ আর থাকবে না।’
নিজের পেশাগত উৎকর্ষ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাজনীতি করার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকে এখন পর্যন্ত কখনোই লেখাপড়া থেকে বিচ্যুত হইনি। আমার কাছে মনে হয়েছে আমার মূল সম্পদ হবে আমার লেখাপড়ার মাধ্যমে পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি। আমি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, আমি পেশাগতভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগটি আমার পেশাগত সেই সমৃদ্ধি বা উৎকর্ষের একটা স্বীকৃতি, যা অত্যন্ত সম্মানের। আমি সেই সম্মানটা ধরে রাখতে চাই। যেহেতু রাষ্ট্রের পক্ষে আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে, তাই এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিকতার মধ্যে আমি নিজেকে সমর্পণ করব না। আমার আদর্শের জায়গাটা একান্তভাবেই আমার নিজের মধ্যে থাকবে। আমার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেটা আমাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করবে না।
তিনি বলেন, আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে সততার সাথে যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রের কল্যাণে আমি সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করব। আর আমার দায়িত্ব পালনকালে সম্পূর্ণভাবে আমি সৎ থাকব।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হওয়ার পর নিজেকে নিয়ে আর কি স্বপ্ন দেখেন? এই প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল) বলেন, মানুষতো আসলে একেকটা বয়সে একেক স্বপ্ন দেখে। আমি আইন পেশায় মোটামুটি যখন থিতু হয়েছি তখন মনে হয়েছে যে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার একটা স্বীকৃতি তো হতে পারে। মহান আল্লাহ আমাকে সেটা দিয়েছেন। এরপরে কি স্বপ্ন সেটা ভাবিনি। মহান আল্লাহ যদি মনে করেন এর থেকে বড় কোনো দায়িত্ব দেবেন সেক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজেকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করব।
নিজের পরিবারের সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস (কাজল) বলেন, আমার স্ত্রী সিনিয়র ব্যাংকার। আমার বড় মেয়ে ব্যারিস্টার (কলের অপেক্ষায়)। আমার চেম্বারেই আমার মেয়ে কাজ শুরু করেছে এবং আমার সাথে কোর্টেও যায়। আর আমার ছোট মেয়ে ‘ও লেভেল’ পরিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে কি পড়বে এখনো পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে আমার কেন জানি মনে হয় তার ওপর তার বড় বোনের খুব প্রভাব সুতরাং সেও তার বড় বোনের মত ল’ পড়তে পারে বলে আমার ধারণা।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল) রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে গত ২৫ মার্চ নিয়োগ পেয়েছেন।
এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৪ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল)-কে পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের অ্যাটর্নি-জেনারেল পদে নিয়োগ প্রদান করলেন। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ বাসস



