সংবিধান মেনেই প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন হুমায়ুন কবির : আইনমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তার শপথ গ্রহণে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি এবং সরকারের সব কার্যক্রম সংবিধান মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান |নয়া দিগন্ত

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার শপথ গ্রহণে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথম কথা হলো আইনে যেটা আছে সেটা আছে, দ্বিতীয় হলো এই সরকার যেটা করেছে সংবিধান মেনেই করেছে। এখানে ব্যত্যয়ের কোনো কিছু ঘটেনি। সুতরাং আমরা যা করেছি সাংবিধানিকভাবেই করেছি। এটাকে বলে ডিমিং ক্লজ। যখন শপথ নেয়া হয়েছে আমরা সাংবিধানিকভাবেই দিয়েছি।’

মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা জানান।

আইনগত সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ও শিশু এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও সমন্বিত সরকারি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতর’, ‘সমাজসেবা অধিদফতর’ এবং ‘মহিলা বিষয়ক অধিদফতর’-এর মধ্যে এক ত্রি-পক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তার শপথ গ্রহণে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি এবং সরকারের সব কার্যক্রম সংবিধান মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।

‘ডিমিং ক্লজ’ ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট

আইনমন্ত্রীর উল্লিখিত ‘ডিমিং ক্লজ’ হলো আইনের এমন একটি ধারা, যার মাধ্যমে আইনগতভাবে ধরে নেয়া হয় যেকোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা বাধ্যবাধকতা আইনি প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে পূরণ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, পদ গ্রহণ বা শপথের মাধ্যমে ধরে নেয়া হয় যে পদে বহাল হওয়ার পূর্বে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার সব আইনি শর্ত পূরণ করেই আসা হয়েছে। সরকারের আইনি অবস্থান অনুযায়ী, সংবিধানের আওতায় টেকনোক্র্যাট কোটায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে এই শর্ত পূরণের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে কার্যকর ধরা হয়েছে।

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টিতে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বা আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হন এবং ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব নাগরিকত্ব ত্যাগের দাফতরিক প্রমাণের বাইরে কেবল ‘ডিমিং ক্লজ’- এর ধারণায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অতিক্রান্ত হয় কি না, তা নিয়ে সংবিধান ও আদালতের চূড়ান্ত ব্যাখ্যার সুযোগ থেকে যায়।

দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে আইনমন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা, গুম ও ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি বন্ধ করে আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশ বাদি হয়ে কোনো মিথ্যা মামলা দায়ের করেনি বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও অসহায় মানুষ যাতে আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা হচ্ছে। কোনো ভুক্তভোগী নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারলে রাষ্ট্র তার পাশে থাকবে।

স্বাক্ষরিত এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের মূল উদ্দেশ্য হলো তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সেবা ও কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষণ, পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রম, মনোসামাজিক সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা হবে।

সমঝোতা স্মারকের আওতায় একটি সমন্বিত রেফারেল ও কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কোনো সেবাগ্রহীতার প্রয়োজনীয় সেবা একটি প্রতিষ্ঠানের আওতার বাইরে হলে তাকে সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানে যথাযথ প্রক্রিয়ায় রেফার করা হবে এবং পরে সেবার অগ্রগতি সম্পর্কে ফলোআপ নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও নির্যাতনের শিকার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী অগ্রাধিকারভিত্তিতে এই সেবা পাবেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা ও সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন সেবার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে। প্রয়োজনে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ রাখা হবে।

একই সাথে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের ১৬৬৯৯, সমাজসেবা অধিদফতরের ১০৯৮ এবং মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের ১০৯ -এই তিনটি জরুরি হেল্পলাইনের মধ্যে আন্তঃসংযোগ ও সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

সমঝোতা স্মারকটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি ‘ত্রিপক্ষীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ এবং জেলা পর্যায়ে ‘জেলা সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হবে। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যৌথ প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, তথ্য বিনিময়, গবেষণা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ করে অসহায়, নির্যাতিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত ও কার্যকর সরকারি আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আশাপ্রকাশ করা হয়।