প্রতারণার মামলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতারণার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
এই মামলায় বাদিপক্ষের আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম হিরণ জানান, ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিবেশক মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের দায়ে গতবছরের ৭ আগস্ট ইউনিলিভার বাংলাদেশ ও এর পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাটি আদালতে দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ প্রদান করেন। তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম গত ৫ জানুয়ারি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তারা হলেন- সৈয়দ জিকরুল বিন জমির (ক্লাস্টার হেড, সেন্ট্রাল সাউথ ক্লাস্টার, কাস্টমার ডেভলপমেন্ট, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড), এম সোয়াইব কামাল, সিনিয়র টেরিটরি ম্যানেজার (ওয়ারী), কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, এরিয়া ম্যানেজার, সেন্ট্রাল সাউথ রিজোন, মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কনজুমার কেয়ার, জিন্নিয়া হক, ফাইন্যান্স ডিরেক্টর ও কোম্পানি হিসেবে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড।
মামলা এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স’কে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড ওয়ারী, মানিকনগর, সদরঘাট, নবাবপুর রোড, মালিবাগ, শ্যামপুর ও মতিঝিল এলাকার জন্য পরিবেশক নিয়োগ করে গত ০৩/১১/২০০৯ তারিখে চুক্তিপত্র করে। চুক্তিপত্রে বাদি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তৎকালীন মালিক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর এ এস এম মাসুদুর রহমান ও ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের পক্ষে তাদের কাস্টমার ডেভলপমেন্ট ডিরেক্টর মিজানুর রশিদ স্বাক্ষর করেন। বাদি প্রতিষ্ঠান পরিবেশক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে গোডাউন ভাড়া, পণ্য বহনের জন্য গাড়ি ক্রয় এবং মাসিক বেতনে জনবল নিয়োগ করে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে।
চুক্তি বলে পরিবেশক হিসেবে চাঁনখারপুল চকবাজারসহ নির্ধারিত এলাকায় ইউনিলিভারের পণ্য- লাক্স, ডাব সাবান, সানস্লিক্স শ্যাম্পু, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিসহ ২৫০টিরও বেশি পণ্য বাজারজাত করতে থাকে। সর্বশেষ গত ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি চুক্তি নাবায়ন করে। বাদির ব্যবসা পরিচালনাকালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিবাদিদের প্রেরিত পণ্যের মধ্যে প্রাপ্ত নষ্ট ডেট এক্সপেয়ার ও ডেমেজড পণ্য বিবাদিদের বরাবর প্রেরণ করে, যার মূল্য তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
চুক্তির শর্ত মোতাবেক ওই নষ্ট, ডেট এক্সপায়ারড ও ডেমেজড পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য প্রদান বা মূল্য ফেরৎ দেয়ার কথা। কিন্তু বার বার তাগাদা দিলেও নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এই নিয়ে বাদি প্রতিষ্ঠানের সাথে বিবাদিদের সাথে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। বাদি প্রতিষ্ঠান বিবাদিদের কাছ থেকে নষ্ট, মেয়াদ উত্তীর্ণ ও ডেমেজ পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য বা মূল্য না পেয়ে বিপুল পরিমাণের লোকশানের সম্মুখীন হন। এমতাবস্থায় বিবাদিরা বাদির প্রতিষ্ঠানকে আরো ক্ষতি করার অসৎ উদ্দেশ্যে নতুন কৌশল অবলম্বন করে। সেই কৌশল হিসেবে সে সকল পণ্য বাজারে কম বিক্রয় হয় তার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় এবং যে সকল পণ্য বাজারে বেশি বিক্রয় হয় তার সরবরাহ কমিয়ে দেয়। ফলে বাজারে পণ্য বিক্রয় কমে যায়, তাতে বাদির পণ্য বিক্রয় কমিশন কমে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিবাদিরা ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের পদস্থ কর্মকর্তা হয়েও অন্য পরিবেশকের কাছ থেকে অবৈধ লাভবান হয়ে অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাদি প্রতিষ্ঠানকে অবাস্তব ও অসামঞ্জস্য বিক্রয় টার্গেট দিয়ে এবং বাজারে কম বিক্রয় হয়- এমন পণ্যের বেশি সরবরাহ করে মার্কেট সেল কমিয়ে দেয়, যার ফলে বাদি প্রতিষ্ঠানের জানুয়ারি ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ১,৬৭,০০,০০০ (এক কোটি সাতষট্টি লাখ ) টাকার ক্ষতি হয়। আবার কোটি টাকার নষ্ট ডেট এক্সপেয়ার ও ডেমেজ পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য প্রদান বা মূল্য ফেরৎ প্রদান না করে নতুন পরিবেশক নিয়োগ দিয়ে ৩,৭৫,০০,০০০.০০ (তিন কোটি পঁচাত্তর লাখ) টাকা আত্মসাৎসহ ৮,৫৩,০০০০০.০০(আট কোটি তেপান্ন লাখ) টাকার ক্ষতি করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, আসামিরা বিবাদিকে বিভিন্ন প্রকার ভয়-ভীতি ও হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে বাদি প্রতিষ্ঠান হাই কোর্টে বিবাদি প্রতিষ্ঠানের নামে একটি অরবিটিশন মামলা দায়ের করে।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেন যে, তদন্তে বিবাদি সৈয়দ জিকরুল বিন জমির, এম সোয়াইব কামাল, কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা এবং জিনিয়া হকদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজসে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে প্রতারণা ও ভয়ভীতির প্রদর্শনপূর্বক অপরাধে সহায়তা করার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।



