রাজধানীর পল্লবীতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলায় দু’জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
আজ সোমবার বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে পল্লবী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান ও এএসআই কামরুজ্জামানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
অপর আসামি সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল হাসানের যাবজ্জীবন দণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একই সাথে আরেক আসামি পুলিশের সোর্স রাসেলকে সাত বছরের সাজা থেকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। অপর আসামি সুমন সাজাভোগ করে আগেই কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন।
২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
আদালতে আসামিপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, আইনজীবী মো: আবদুর রাজ্জাক এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বদিউজ্জামান তপাদার। বাদিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল করিম। রায় ঘোষণার পুরো সময় মামলার বাদি নিহত ইশতিয়াকের ভাই ইমতিয়াজ হোসেন ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
দণ্ডিত পাঁচ আসামির মধ্যে কামরুজ্জামান (তৎকালীন এএসআই) শুরু থেকে পলাতক।
এর আগে, ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন হয়। ইশতিয়াক হোসেনকে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট মামলা করা হয়, যেটি ওই আইনে করা প্রথম কোনো মামলা। এই মামলায় ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রায় দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ।
রায়ে যাবজ্জীবন বহাল থাকা আসামিদের দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ভিকটিম জনির পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে। ১০ বছর সাজাপ্রাপ্ত আসামি এএসআই রাশেদুল হাসানকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
গতকাল রোববার ও আজ সোমবার দুই দিনব্যাপী এ রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
এর আগে, গত ৭ আগস্ট এ মামলার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিলের শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়।
মামলার বিবরণে থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ইরানি ক্যাম্পের বাসিন্দা মো: বিল্লালের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ছিল। সে অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স সুমন নারীদের সাথে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় সেখানে থাকা ইশতিয়াক ও তার ভাই ইমতিয়াজকে সুমন চলে যেতে বলেন। এ নিয়ে সুমনের সাথে দুই ভাইয়ের বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে সুমনের ফোনে পুলিশ এসে ইশতিয়াক ও ইমতিয়াজকে ধরে নিয়ে যায় এবং থানায় নিয়ে দুই ভাইকে নির্যাতন করে। এতে ইশতিয়াকের অবস্থা খারাপ হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ইশতিয়াকের ভাই ইমতিয়াজ হোসেন একই বছরের ৭ আগস্ট মামলা করেন। সে মামলায় তৎকালীন পল্লবী থানার এসআই জাহিদুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়।
এক পর্যায়ে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। সে তদন্ত প্রতিবেদনে পাঁচ জনকে অভিযুক্ত এবং পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। তদন্তকালে এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামানকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এ মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর বিচার শেষে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রায় দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ। সে রায়ে পল্লবী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল হাসান ও এএসআই কামরুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে বাদি বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। অপর দুই আসামি পুলিশের সোর্স (তথ্যদাতা) সুমন ও রাসেলের সাত বছর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন বিচারিক আদালত। দণ্ডিত পাঁচ আসামির মধ্যে কামারুজ্জামান (তৎকালীন এএসআই) শুরু থেকে পলাতক। অপর আসামি সুমন সাজাভোগ করে বেরিয়ে গেছেন।
এদিকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জাহিদুর, রাশেদুল ও রাসেল ২০২০ সালে হাইকোর্টে পৃথক আপিল করেন। ২০২১ সালে হাইকোর্ট সে সব আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। গত ৯ জুলাই এসব আপিল হাইকোর্টে একসাথে শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে গত ৭ আগস্ট হাইকোর্ট রায়ের জন্য ১০ আগস্ট দিন ধার্য করেন।



