এনডিএফ’র স্বাস্থ্য বাজেট কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা

বাজেট বাড়ালেই হবে না বাস্তবায়নকারীদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে

‘স্বাস্থ্যখাতে টাকার কোনো অভাব নেই, কিন্তু তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা নেই। তিনি যশোরের চৌগাছা মডেল বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন সরকারকে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক
ন্যাশনাল ডক্টটরস ফোরাম (এনডিএফ) কর্তৃক আয়োজিত বাজেটোত্তর স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালা
ন্যাশনাল ডক্টটরস ফোরাম (এনডিএফ) কর্তৃক আয়োজিত বাজেটোত্তর স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালা |সংগৃহীত

স্বাস্থ্য বাজেট শুধু অর্থ বাড়ালেই হবে না, বাস্তবায়নকারীদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। এখন থেকেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে না পারলে বরাদ্দ টাকা খরচ করা সম্ভব হবে না, ফেরত যাবে টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যে বরাদ্দ করলেও রিভাইজড বাজেটে তা ২২৮ হাজার কোটি টাকায় ঠেকে। এটা হয়েছে অর্থ খরচ করার সক্ষমতা না থাকায়। চলতি বছর স্বাস্থ্যে যে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের কাছাকাছি হয়েছে, বাজেট বেড়েছে ৯৬ শতাংশ, সেজন্য বর্তমান সরকারকে অনেক ধন্যবাদ।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) উদ্যোগে স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭ উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক কর্মশালায় আইন প্রণয়নকারী, অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা: মুসলেহ উদ্দিন ফরিদ। এবারের স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্লেষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. সদরুল ইসলাম, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ প্রমুখ।

সভাপতিত্ব করেন এনডিএফ’র সিনিয়র সহসভাপতি ডা: এ কে এম ওয়ালীউল্লাহ। উপস্থিত ছিলেন এনডিএফ’র জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা: মাহমুদ হোসেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সদস্যরা।

অনুষ্ঠানে ডা: মুসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, আগামী অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনেক ভালো হয়েছে, আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের জন্য মূল সমস্যা জনবল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৮০ হাজার পদ খালি রয়েছে। তাছাড়া দক্ষ জনবলেরও অভাব, ডাক্তারদের মধ্যে অনেকেই চাপ অনুভব করলে বিদেশ চলে যাচ্ছেন। উপজেলায় পোস্টিং হলেও ডাক্তাদের একটা অংশ সেখানে থাকতে চান না।

ডা: মুসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যে বাজেট কম থাকায় ব্যক্তির পকেট থেকে যে টাকা খরচ করতে হয় এটা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। তিনি একটি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলেন, ২০২০ সালে ব্যক্তির পকেট থেকে (চিকিৎসায় ব্যক্তির খরচ) বাংলাদেশে ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। চিকিৎসার মোট ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ খরচ হয় ব্যক্তির পকেট থেকে। যেখানে ভারতে এই খরচ হয় ৪০ শতাংশ, মালদ্বীপে ২০ শতাংশ। স্বাস্থ্যে অর্থ বাড়াতে না পারলে এদেশের মানুষের স্বাস্থ্যোন্নয়ন হবে না। স্বাস্থ্যবান জাতি গড়তে না পারলে দেশের উন্নয়নও হবে না। তিনি স্বাস্থ্যে গবেষণা বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলেন ২০২৫ সালে ইংল্যান্ডে শুধু গবেষণার জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাতে কেবল গবেষণায় এসেছে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের স্বায়ত্বশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে কোনো হাসপাতালই স্বায়ত্বশাসিত নয়, তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারেন না। কিন্তু ইংল্যান্ডে ২২৮ ডিস্ট্রিক হাসপাতালে প্রায় সবগুলো অটোনোমাস, তারা নিজেরা ব্যয় করতে পারে। বাংলাদেশেও হাসপাতালগুলো ব্যয় করার ক্ষমতা দিতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে টাকার কোনো অভাব নেই, কিন্তু তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা নেই। তিনি যশোরের চৌগাছা মডেল বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন সরকারকে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী স্বাস্থ্যে বড় অঙ্ক বরাদ্দ করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ওষুধ দিতে পারে না সরকারি ওষুধ কোম্পানি ইডিসিএল। কিন্তু সরকার লোকাল ওষুধ কোম্পানি থেকে ওষুধ কিনে নিয়ে হাসপাতালে সরবরাহ করতে পারে। তিনি ই-হেলথ কার্ডে ব্যয় করার জন্য কার্ডধারীকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের দাবি করেন।

ড. রুমানা হক বলেন, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা খরচের ৭৯ শতাংশ খরচ হয় ব্যক্তির পকেট থেকে। আবার ওষুধ কিনেতে সবচেয়ে বেশি ৬৮ শতাংশ টাকা ব্যয় করতে হয়। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে স্বাস্থ্যে আরো ব্যয় বাড়াতে হবে। অবশ্য সরকার বলেছে, ক্রমান্বয়ে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করা হবে স্বাস্থ্যে। বর্তমান বাজেটে কার্ডিয়াক স্টেন্ট, চোখের লেন্স, কিডনি ডায়ালাইসিসের বিভিন্ন যন্ত্রাপাতি, মেশিনারিজ ও ক্যান্সারের ওষুধে ভ্যাট-ট্যাক্স জিরো করে দেয়ায় ব্যক্তির পকেট থেকে অর্থ খরচ কমে আসবে, এটাকে তিনি সাধুবাদ জানান।