ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকপাচার রোধে ফ্রান্সের নজিরবিহীন উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে হলে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়; বরং সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগই একমাত্র কার্যকর পথ।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো |নয়া দিগন্ত

ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকপাচার, অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্য, মানবপাচার এবং সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মার্টিনিকে অনুষ্ঠিত প্রথম আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, ফ্রান্স, ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে হলে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়; বরং সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগই একমাত্র কার্যকর পথ।

ফ্রান্স ইনফো’র তথ‍্যমতে, মার্টিনিকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ৪০টি দেশ অংশ নেয় এবং মাদকপাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবেলায় একযোগে কাজ করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়।

জ্যাঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘এই অপরাধচক্রগুলো কেবল মাদকপাচারেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্য, মানবপাচার এবং অর্থপাচারের মতো নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এসব নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরো ক্যারিবীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাই অংশ নেয়া দেশগুলো একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় কাজ করতে সম্মত হয়েছে, যাতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নজরদারি এবং যৌথ অভিযান আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।’

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত নভেম্বরে কলম্বিয়ায় আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার সময় ১২টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৮টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং আরো ২৩টি চুক্তি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে আলোচনা চলছে।

তার মতে, এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে অপরাধ তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরো জানান, অংশীদার দেশগুলোতে ফ্রান্স তার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করেছে। ফরাসি দূতাবাসগুলোতে কর্মরত পুলিশ, কাস্টমস কর্মকর্তা এবং সামরিক সংযোগ কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এসব কর্মকর্তা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং যৌথ অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তুলতে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে একটি আঞ্চলিক মাদকবিরোধী প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। আগামী সেপ্টেম্বরে এই অ্যাকাডেমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এখানে ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, কাস্টমস ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে মাদকপাচার রোধ, আর্থিক অপরাধ তদন্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।

মাদকপাচারকারী চক্রগুলোর আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার কাজ করছে বলে জানান জ্যাঁ-নোয়েল বারো। এই ব্যবস্থার আওতায় মাদকপাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্পদ জব্দ, আর্থিক লেনদেন সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, শুধু পাচারকারী গ্রেফতার করলেই হবে না; তাদের অর্থের উৎসও বন্ধ করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন সহযোগিতা চুক্তিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা। এ জন্য বিভিন্ন দেশের প্রশাসনে বিশেষ লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। তারা সন্দেহভাজন পাচারকারী, মাদকবাহী চালান, অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে আদান-প্রদান করবেন। একইসাথে অপরাধীদের গ্রেফতার, মাদকবাহী জাহাজ বা চালান আটক এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াও আরো সহজ হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু আক্রমণাত্মক সামুদ্রিক অভিযানের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও জ্যাঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘ফ্রান্স আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও ফরাসি গায়ানায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ, বহু পাচারকারী গ্রেফতার এবং অপরাধীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামুদ্রিক রুট অকার্যকর করে তোলা সম্ভব হয়েছে। এতে মাদক চোরাচালানকারীদের কার্যক্রম পরিচালনা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।’

নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলের সাম্প্রতিক মানবিক সঙ্কটের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। মার্টিনিকের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করছে। এসব ত্রাণ দ্রুত ভেনেজুয়েলায় পৌঁছে দিতে সম্ভাব্য সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে এমন ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হবে, যাতে মার্টিনিক থেকে পাঠানো মানবিক সহায়তা দ্রুত ও নিরাপদভাবে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্টিনিকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন ক্যারিবীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আন্তর্জাতিক মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান, আইনি সহযোগিতা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে একত্রিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায় ফ্রান্স। সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ক্যারিবীয় অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।