ফ্রান্সের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রভাবশালী ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনগতভাবে বাধামুক্ত হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আপিল আদালত তাকে কারাদণ্ড দিলেও নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার বহাল রেখেছে। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্রেসলেট পরতে হবে, যা তার নির্বাচনী প্রচারণাকে কার্যত সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম হাফপোস্ট ফ্রান্স-এর সূত্রমতে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ফরাসি আপিল আদালত রায় ঘোষণা করে জানায়, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে মেরিন ল্য পেন দোষী। আদালত তাকে ১৫ মাসের কারাদণ্ড দেয়। এর মধ্যে ১২ মাস ইতোমধ্যে গণনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাকে কারাগারে যেতে হচ্ছে না। ফলে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তার আর কোনো বাধা নেই।
তবে রায়ের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইলেকট্রনিক ব্রেসলেটের বিষয়টি। ফ্রান্সে এই ধরনের সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির চলাফেরা নির্দিষ্ট সময়সূচি ও আদালতের শর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে বাড়িতে অবস্থান, ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। ফলে একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য দেশব্যাপী জনসভা, নির্বাচনী সফর এবং ভোটারদের সাথে ধারাবাহিক যোগাযোগ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
মারিন ল্য পেন আগে থেকেই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট পড়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে রাজি নন। তার মতে, একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অবাধে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা থাকতে হবে।
তিনি মন্তব্য করেন, যদি কোনো বিচারকের অনুমতির ওপর নির্ভর করে কোথাও জনসভা করতে যেতে হয়, তাহলে সেটি স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা নয়। তার ভাষায়, প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দিয়ে যদি বাস্তবে স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালানোর সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায়ের পর মেরিন ল্য পেনের সামনে দু’টি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ব্রেসলেট পরেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পূর্বের ঘোষণায় অটল থেকে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন এবং দলের নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে পারেন।
এদিকে, বিরোধী নেতারা বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী সাব্যস্ত একজন রাজনীতিবিদ কিভাবে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন? কেউ কেউ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, একসময় মেরিন ল্য পেনের রাজনৈতিক দল নাসিওনাল ফ্রঁ-এর অন্যতম স্লোগান ছিল ‘পরিষ্কার হাত, উঁচু মাথা’। সেই নৈতিক অবস্থান এখন কতটা বজায় রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সামনে কোনো বক্তব্য দেননি মেরিন ল্য পেন। তবে তার আইনজীবী রোদলফ বোসেলু জানান, আদালত অযোগ্যতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে এবং এটি তাদের জন্য ইতিবাচক দিক। পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে, সে বিষয়ে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে, ফ্রান্সের ডানপন্থী দল রাসঁব্লমঁ নাসিওনাল-এর ভেতরেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলের তরুণ সভাপতি জর্দান বারদেলাকে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, আরএন সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আদালতের রায় যাই হোক না কেন, ২০২৭ সালের নির্বাচনে বারদেলাকে প্রার্থী করা উচিত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ ফরাসি রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন ল্য পেন নিজেই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামবেন, নাকি দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব জর্ডান বারদেলার হাতে তুলে দেবেন; সেই সিদ্ধান্তই ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই নির্ধারণ করবে।



