ইউরোপীয় আদালতে সারকোজির আবেদন গ্রহণ, ফরাসি বিচারব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক

ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজির আড়ি পাতা মামলায় করা আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত। মামলায় আইনজীবী-গ্রাহকের গোপনীয়তা, টেলিফোনে নজরদারি এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা আদালত পর্যালোচনা করবে। এই রায় ভবিষ্যতে ইউরোপের বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
নিকোলা সারকোজি ও তার আইনজীবী পাত্রিস স্পিনোজি
নিকোলা সারকোজি ও তার আইনজীবী পাত্রিস স্পিনোজি |নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির বহুল আলোচিত ‘পল বিসম্যু’ বা ‘আড়ি পাতা কেলেঙ্কারি’ মামলায় করা আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (সেদেহ)।

সারকোজির আইনজীবী পাত্রিস স্পিনোজি বলেন, ‘আদালতের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এ মামলার রায় ইউরোপের বিচারব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য নজির স্থাপন করতে পারে।’

ফরাসি দৈনিক লে ফিগারোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পিনোজি জানান, গত সপ্তাহে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেন ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত সারকোজির আবেদনটি ফ্রান্স সরকারের কাছে পাঠিয়েছে এবং মামলাটি পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে। তার মতে, আদালত সব আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করে না। তাই এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে বিচারকরা মামলাটিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন দেখেছেন, যা ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের আলোকে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

সারকোজির বিরুদ্ধে মামলাটির সূত্রপাত হয় ২০১৪ সালে। তদন্তকারীরা অভিযোগ করেন, তিনি তার দীর্ঘদিনের আইনজীবী তিয়েরি এরজগ-এর মাধ্যমে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক গিলবের আজিবের-এর কাছ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। এর বিনিময়ে আজিবেরকে একটি উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত চলাকালে সারকোজি ও তার আইনজীবী একটি গোপন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন, যা ‘পল বিসম্যু’ ছদ্মনামে নিবন্ধিত ছিল। সেই কারণেই মামলাটি পরে ‘বিসম্যু আড়িপাতা মামলা’ নামে পরিচিতি পায়।

তদন্তের সময় বিচারিক কর্তৃপক্ষ সারকোজি ও তার আইনজীবীর টেলিফোনে কথোপকথনে আড়ি পাতেন। সেই রেকর্ডকৃত আলাপচারিতাকে পরে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ২০২১ সালে প্যারিসের একটি আদালত সারকোজিকে দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। পরে আপিলেও রায় বহাল থাকে এবং ২০২৩ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত তার চূড়ান্ত আপিল খারিজ করে দেন।

চূড়ান্ত রায় অনুযায়ী, সারকোজিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়, যার মধ্যে এক বছর ইলেকট্রনিক নজরদারির আওতায় ভোগ করতে হয় এবং বাকি দুই বছর স্থগিত রাখা হয়। একই মামলায় আইনজীবী তিয়েরি এরজগ এবং বিচারক গিলবের আজিবেরও দোষী সাব্যস্ত হন। আজিবের পরে মৃত্যুবরণ করেন।

ফ্রান্সে আইনি লড়াই শেষ হওয়ার পর সারকোজি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দ্বারস্থ হন। তার দাবি, বিচারিক তদন্তে ব্যবহৃত পদ্ধতি তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে আইনজীবীর সাথে ব্যক্তিগত ও গোপন যোগাযোগের ওপর নজরদারি চালানো এবং সেই আলাপচারিতাকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদে স্বীকৃত ন্যায্য বিচার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী।

আইনজীবী স্পিনোজির মতে, মামলাটি শুধু সারকোজির ব্যক্তিগত বিষয় নয়। বরং এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে; কোন সীমা পর্যন্ত রাষ্ট্র একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তার আইনজীবীর মধ্যে হওয়া যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আইনজীবী-গ্রাহক সম্পর্কের গোপনীয়তা বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। যদি সেই গোপনীয়তার সীমানা নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে এর প্রভাব পুরো ইউরোপের বিচারব্যবস্থায় পড়বে।’

স্পিনোজি আরো উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের চূড়ান্ত রায় ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে বিচারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে টেলিফোনে আড়ি পাতা, গোপন নজরদারি, আইনজীবী-গ্রাহক গোপনীয়তা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার সম্পর্কিত মামলায় এই রায়ের গুরুত্ব থাকবে।

এখন মামলার পরের ধাপে ফ্রান্স সরকার আদালতে তাদের লিখিত জবাব জমা দেবে। এরপর উভয় পক্ষের যুক্তি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন যে ফ্রান্সের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সারকোজির মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালত যদি সারকোজির পক্ষে রায় দেন, তাহলে তা শুধু সাবেক এই প্রেসিডেন্টের মামলার জন্যই নয়, বরং ফ্রান্সের বিচারিক তদন্ত পদ্ধতি এবং ইউরোপজুড়ে গোপন নজরদারির বৈধতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের পক্ষে রায় এলে দেশটির বিচারব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের পদ্ধতির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাও আরো শক্তিশালী হবে।

ফলে ‘সারকোজি বনাম ফ্রান্স’ মামলা এখন শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির আইনি লড়াই নয়; এটি ইউরোপে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায্য বিচার এবং বিচারিক তদন্তের সীমারেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।