ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বর্তমান ল্য হাভরের মেয়র এবং ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী এদুয়ার ফিলিপকে ঘিরে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চলমান তদন্ত নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্যারিস প্রশাসনিক আদালত অভিযোগ উত্থাপনকারী এক সাবেক সরকারি কর্মকর্তার হুইসেলব্লোয়ার (সতর্কবার্তা প্রদানকারী) মর্যাদা বহাল রাখার রায় দিয়েছে। আদালতের এ সিদ্ধান্ত তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, যদিও এটি অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো রায় নয়।
ফরাসি গণমাধ্যম এএফপি ও ল্য পারিজিয়াঁ’র সূত্রমতে, মামলার সূত্রপাত একটি চুক্তিকে কেন্দ্র করে, যা ল্য হাভর সিটি হল এবং একটি বেসরকারি সমিতির মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের অপব্যবহার, পক্ষপাতমূলক সুবিধা দেয়া, অবৈধ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমানে একজন তদন্তকারী বিচারক বিচারিক তদন্ত পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ উত্থাপনকারী কর্মকর্তা, যিনি ‘জুডিথ’ নামে পরিচিত (আসল নাম গোপন রাখা হয়েছে), ল্য হাভর নগর সম্প্রদায়ের সাবেক উপ-মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি ২০২১ সাল থেকেই এদুয়ার ফিলিপকে ঘিরে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন। তার অভিযোগ ছিল, একটি সরকারি চুক্তি এমনভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থকে সুবিধা দিতে পারে।
পরে ২০২৩ সালে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় আর্থিক প্রসিকিউটর দফতরে (পিএনএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পিএনএফ তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানে তল্লাশি চালায়। এরপর ২০২৫ সালের জুনে জুডিথ দেওয়ানি পক্ষ হিসেবে অভিযোগ দায়ের করলে আইন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিচারিক তদন্ত শুরু হয়।
এদিকে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুডিথকে আনুষ্ঠানিকভাবে হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফরাসি আইনে এই মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তিরা চাকরি হারানো, হয়রানি, আইনি চাপ কিংবা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশেষ সুরক্ষা পান।
তবে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি ল্য হাভর সেইন মেত্রোপোল কর্তৃপক্ষ, যার সভাপতিত্ব করছেন এদুয়ার ফিলিপ। তারা প্যারিস প্রশাসনিক আদালতে আবেদন করে দাবি করে, হুইসেলব্লোয়ার স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত যথাযথ কর্তৃপক্ষ নেননি এবং পুরো প্রক্রিয়ায় আইনি ত্রুটি ছিল। কিন্তু গত বুধবার আদালত সেই আবেদন সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে দেয়।
আদালত তার রায়ে উল্লেখ করে, হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে কাউকে স্বীকৃতি দেয়া মানে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়া নয়। এই স্বীকৃতি কেবল অভিযোগকারী ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ বা তার বিরুদ্ধে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তের সমতুল্য নয়। একইসাথে আদালত ল্য হাভর সেইন মেত্রোপোলকে জুডিথের আইনি ব্যয় বাবদ এক হাজার ৮০০ ইউরো পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে, এদুয়ার ফিলিপ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো আইন লঙ্ঘন করেননি এবং নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে মনে করেন। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে তিনি ঘোষণা দেন, এই তদন্তে ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হলেও তিনি ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী থাকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের অন্যতম জনপ্রিয় মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচিত এদুয়ার ফিলিপের বিরুদ্ধে চলমান এই তদন্ত আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরো তীব্র করে তুলতে পারে। তবে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং আদালত এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণ করেনি। ফলে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে এই বহুল আলোচিত মামলার ভবিষ্যৎ।



