জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশী পাড়ি জমান মালদ্বীপে। দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্যানুসারে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মালদ্বীপে স্ট্রোক, হৃদরোগ, দুর্ঘটনা ও অন্য কারণে আটজন প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যুর হয়েছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক বা হৃদরোগ। তাদের অধিকাংশেরই বয়স ২১ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
গত ২৫ জুলাই ২৩ বছর বয়সী রবিউল ইসলাম রওশনের মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী আনজু মনোয়ারা আখির তথ্য মতে, জীবিকার তাগিদে মাত্র সাত মাস আগে রবিউল মালদ্বীপে যান। কর্মস্থলে অসাবধানতাবশত মিক্সার মেশিন দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মো: মনির উদ্দিনের ছেলে।
দ্বিতীয়জন ৪৫ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির। তার স্ত্রী কুলসুম জানান, ১৯ বছর ধরে মালদ্বীপের একটি রিসোর্টে তিনি বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন। গত ২৭ জুলাই হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করলে সহকর্মীদের সহায়তায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক স্ট্রোকজনিত কারণ দেখিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার সোনারগঞ্জ গ্রামের আলী হোসাইনের ছেলে।
তৃতীয়জন ২১ বছর বয়সী সোলাইমান মাতব্বর। তার ভগ্নীপতি মো: আলী জানান, ভাগ্য বদলের আশায় দেড় বছর আগে মালদ্বীপে আসেন সোলাইমান। কিন্তু গত শনিবার কর্মস্থলে ভুলবসত তারপিন পান করে ফেলেন। পরে সহকর্মীরা তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বাড়ি মাদারীপুর জেলার বহেরাতলা উপজেলার শিবচর ইউনিয়নে। তার বাবার নাম সেন্টু মাতব্বর।
চতুর্থজন ৪৪ বছর বয়সী সায়েদ মোল্লা। তার মেয়ে ইয়াসমিন আক্তার জানান, সায়েদ ২০ বছর যাবত মালদ্বীপে বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন। গত শনিবার নিজ রুমে স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। তিনি শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার মুলফৎগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মো: কালাই মোল্লা।
পঞ্চমজন ৩৭ বছর বয়সী বদিউর রহমান। তার আত্মীয় আনোয়ার হোসেনের তথ্য মতে, ১০ বছর যাবত বৈধভাবে মালদ্বীপের একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। গত শনিবার নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। বর্তমানে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি ফরিদপুর জেলা ভাঙ্গা উপজেলার শরীফাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম কাশেম মাতব্বর।
ষষ্ঠজন ৪৫ বছর বয়সী মো: শেখ ফরিদ। তার আত্মীয় বাপ্পির তথ্য মতে, ফরিদ দুই বছর আগে নতুন করে কর্মসংস্থানের উদ্দেশে মালদ্বীপে আসেন। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হঠাৎ করে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সহকর্মীরা তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে স্ট্রোকজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তিনি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের নশা মিয়ার ছেলে।
সপ্তমজন ৪৭ বছর বয়সী মকবুল মিয়া। তার স্ত্রী রহিমা আক্তারের তথ্য মতে, মকবুল ২০ বছর যাবত মালদ্বীপের বিভিন্ন কোম্পানিতে বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু গত ২৮ জুলাই স্ট্রোকজনিত কারণে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার আউটবাগ গ্রামের জাফর মিয়ার ছেলে।
অষ্টমজন ৭০ বছর বয়সী দেলওয়ারা নবি। গত সোমবার রাতে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি মালদ্বীপের থ্রিটপ হাসপাতালের অজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. নবির সহধর্মিণী। তার বাড়ি বরিশাল জেলার নতুন বাজার কলেজ রোডের কোতোয়ালি মডেল এলাকায়।
লাশগুলো দেশে ফেরাতে সরকার ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কামনা করেন মৃতদের পরিবার।
এ বিষয়ে মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশন এক গণমাধ্যমকে বলেন, মৃত প্রবাসী ভাই-বোনদের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। ইতোমধ্যে হুমায়ুন কবির এবং সায়েদ মোল্লার লাশ দেশে পাঠানো হয়েছে। বাকিদেরও পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে আমরা মালদ্বীপের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে তাদের লাশ দেশে পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অভিবাসন ব্যয়ের তুলনায় কম আয়ের কারণে মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিন স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একাকীত্বই প্রবাসী কর্মীদের হৃদরোগের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



