ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে কিছুটা দূরে সেঁ নদীর তীরে অবস্থিত ছোট্ট ঐতিহাসিক জনপদ লা রশ-গুইয়োঁ। প্রাচীন দুর্গ, নদী আর শান্ত গ্রামীণ পরিবেশের জন্য পরিচিত এই শহরেই রয়েছে বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার পথিকৃৎ নোভেরা আহমেদের নামে একটি বিশেষ জাদুঘর—মুজে নোভেরা আহমেদ।
বাংলাদেশের একজন শিল্পীর নামে ফ্রান্সের মাটিতে এমন একটি জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা শুধু নোভেরা আহমেদের ব্যক্তিগত শিল্পজীবনের স্বীকৃতি নয়, একই সাথে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। জাদুঘরটি ২০১৮ সালের জুলাইয়ে লা রশ-গুইয়োঁতে চালু হয় এবং সেখানে নোভেরার ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম ও তার শিল্পজীবনের নানা স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে।
মুজে নোভেরা আহমেদ অবস্থিত ১৯ র্যু দ্যু দকতর দুভাল ঠিকানায়। জাদুঘরটির উদ্দেশ্য নোভেরা আহমেদের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের পাশাপাশি তার শিল্প-ঐতিহ্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। জাদুঘরটির নিজস্ব পরিচিতিতেও নোভেরার উত্তরাধিকার সংরক্ষণ ও প্রচারের কথা বলা হয়েছে।
নোভেরা আহমেদ বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার অন্যতম অগ্রদূত। ১৯৩৯ সালে জন্ম নেয়া এই শিল্পী এমন এক সময়ে ভাস্কর্যচর্চায় এগিয়ে আসেন, যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে একজন নারী শিল্পী হিসেবে তার পথচলা ছিল আরো কঠিন। কিন্তু প্রচলিত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা এক শিল্পভাষা।
নোভেরা লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস-এ ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্য বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি চেক ভাস্কর কারেল ভোগেলের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন এবং ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইন অর্জন করেন। পরে ইতালির ফ্লোরেন্সে ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির কাছ থেকেও শিল্পশিক্ষা নেন।
দেশে ফিরে নোভেরা দ্রুত নিজের স্বতন্ত্র শিল্পরীতি গড়ে তোলেন। তার শিল্পে আধুনিক পাশ্চাত্য ভাস্কর্যের প্রভাব যেমন ছিল, তেমনি ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, প্রকৃতি, মানবদেহ, প্রাণী এবং বৌদ্ধ শিল্পভাবনার উপস্থিতি। তার প্রাথমিক অনেক কাজ তৈরি হয়েছিল সিমেন্টে। পরবর্তী সময়ে তিনি লোহা, ইস্পাত, তামা ও ব্রোঞ্জের মতো ধাতু নিয়েও কাজ করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রভাবও তার শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
১৯৫৭ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের দেয়ালে নোভেরা আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম দিককার আধুনিক ফ্রিজ বা দেয়ালভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। পরের বছর ১৯৫৮ সালে তিনি তৈরি করেন ‘কাউ উইথ টু ফিগারস’, যেটিকে বাংলাদেশের প্রথম দিককার উন্মুক্ত স্থানের আধুনিক ভাস্কর্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে ঢাকায় তিনি প্রায় একশটি ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন বলে শিল্প-গবেষণামূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৬০ সালের আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তার একক প্রদর্শনী ‘ইনার গেজ’ নোভেরা আহমেদের শিল্পজীবনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ওই প্রদর্শনীতে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে তৈরি প্রায় ৭৫টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছিল। এটিকে বাংলাদেশের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীগুলোর অন্যতম এবং আধুনিক ভাস্কর্যচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা শহীদ মিনারের নকশার সাথেও নোভেরা আহমেদের নাম জড়িয়ে আছে। শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে তিনি শহীদ মিনারের নকশা প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। এ নকশার মূল ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে নোভেরার শিল্প-জীবন ও বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের বিকাশের সাথে শহীদ মিনারের ইতিহাসের এই সম্পর্ক তাকে বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে।
নোভেরার শিল্পজীবনের সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ষাটের দশকে তিনি প্যারিসে যাতায়াত শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। প্যারিসে তিনি আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি , সেজার এবং আসগার ইয়র্নের মতো শিল্পীদের সাথে পরিচিত হন।
১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে প্যারিসের গ্যালারি রিভ গশ-এ নোভেরা আহমেদের একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তার ধাতব ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী শিল্পভাবনার প্রভাবও তার সে সময়ের কাজে স্পষ্ট ছিল।
তবে ১৯৭৩ সালের বড়দিনের আগের রাতে একটি ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনা তার জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। দুর্ঘটনার পর তার শারীরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তী জীবনে তাকে হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তারপরও শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা থামেনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি ছবি আঁকা ও শিল্পচর্চা চালিয়ে যান।
চার দশকের বেশি সময় পর ২০১৪ সালে প্যারিসে তার কাজ নিয়ে আবারো বড় ধরনের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীর নাম ছিল ‘নোভেরা, রেত্রোসপেক্তিভ ১৯৬৯–২০১৪’ বা ‘নোভেরা : ১৯৬৯–২০১৪-এর পুনরালোচনা।’ এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ফ্রান্সের শিল্পাঙ্গনে নোভেরা আহমেদের কাজ নতুন করে আলোচনায় আসে।
২০১৫ সালের ৬ মে ফ্রান্সে নোভেরা আহমেদের জীবনাবসান হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার শিল্পকর্মের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। তার স্বামী গ্রেগোয়ার দ্য ব্রুনসের উদ্যোগে নোভেরার শিল্পকর্ম ও স্মৃতি সংরক্ষণের একটি স্থায়ী উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে লা রশ-গুইয়োঁতে মুজে নোভেরা আহমেদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই জাদুঘরের বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু নোভেরা আহমেদের নাম সংরক্ষিত হয়নি; তার জীবনের ফ্রান্সপর্বের শিল্পকর্মের একটি উল্লেখযোগ্য সংগ্রহও রাখা হয়েছে। ফরাসি শিল্পবিষয়ক গবেষণামূলক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নোভেরার জীবনের শেষ কয়েক দশকের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ এই জাদুঘরে রয়েছে। তার ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মের মাধ্যমে দর্শক একজন বাংলাদেশী শিল্পীর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক শিল্পযাত্রার সাথে পরিচিত হতে পারেন।
নোভেরা আহমেদের শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উপকরণের অভিনব ব্যবহার। প্রথমদিকে সিমেন্ট ও কংক্রিটের মতো উপকরণ ব্যবহার করলেও পরে তিনি ধাতু ও বিভিন্ন পুনর্ব্যবহৃত বস্তু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি ধাতব ভাস্কর্য এবং উন্মুক্ত স্থানের শিল্পকর্ম তৈরি করেন। এমনকি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত মার্কিন বিমানের ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করেও তিনি শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছিলেন।
বাংলাদেশে নোভেরা আহমেদের শিল্প-ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে তার ৩৩টি ভাস্কর্য রয়েছে বলে শিল্প-গবেষণামূলক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে তার শিল্প নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং ১৯৯৮ সালে তার পুরোনো কাজ নিয়ে জাতীয় জাদুঘরেও উদ্যোগ নেয়া হয়।
১৯৯৭ সালে নোভেরা আহমেদকে বাংলাদেশ সরকার একুশে পদকে ভূষিত করে। সে সময় তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন এবং তার অনুপস্থিতিতেই এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে তার অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত এটি। তবে অজ্ঞাত কারণে তিনি জীবদ্দশায় পুরস্কারটি গ্রহণ করেননি। ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাস তার স্বামীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একুশে পদকটি হস্তান্তর করে।
নোভেরা আহমেদের নামে ফ্রান্সে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তাই কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত স্মৃতি সংরক্ষণের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের আন্তর্জাতিক যাত্রারও একটি প্রতীক। যে শিল্পী নিজের দেশে আধুনিক ভাস্কর্যের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন, তার শিল্প আজ ফ্রান্সের একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত হচ্ছে।
ফ্রান্সের লা রশ-গুইয়োঁতে নোভেরা আহমেদের স্মৃতি ও শিল্পকর্ম দেখতে আসা পর্যটকদের মধ্যেও বিষয়টি বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে। প্যারিস থেকে আসা পর্যটক মারি দুবোয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন শিল্পীর কাজ ও স্মৃতি ফ্রান্সের এই ছোট্ট শহরে এত যত্নের সাথে সংরক্ষিত হচ্ছে—এটি সত্যিই চমৎকার অভিজ্ঞতা।
জ্যঁ-পিয়ের মার্তাঁ, লিয়ঁ থেকে আসা আরেক পর্যটক বলেন, ‘নোভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের মধ্যে এক ধরনের স্বতন্ত্র শক্তি রয়েছে। তার সম্পর্কে জানার পর বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প সম্পর্কে আমার আগ্রহ আরো বেড়েছে।’
বেলজিয়াম থেকে আসা পর্যটক সোফি ভান দের মেয়ার বলেন, ‘এখানে এসে শুধু একটি শিল্পীর কাজ দেখিনি, বরং বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সুন্দর সংযোগও অনুভব করেছি।’
লা রশ-গুইয়োঁর শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে মুজে নোভেরা আহমেদ যেন দুই ভিন্ন ভূখণ্ডের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করেছে। একদিকে বাংলাদেশের মাটি, লোকঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও আধুনিক শিল্পের সূচনাপর্ব; অন্যদিকে প্যারিস, ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ এবং আন্তর্জাতিক শিল্পজগত। নোভেরা আহমেদের জীবন ও শিল্প এই দুই জগতকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যের ইতিহাস লিখতে গেলে নোভেরা আহমেদের নাম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার ফ্রান্সের মাটিতে তার নামে একটি জাদুঘরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, তার শিল্পজীবনের গুরুত্ব কেবল বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। লা রশ-গুইয়োঁর মুজে নোভেরা আহমেদ আজ সেই দীর্ঘ শিল্পযাত্রার একটি স্থায়ী স্মারক, যেখানে একজন বাংলাদেশী নারী শিল্পীর সৃজনশীলতা ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।



