ঢাবি প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘শুনতে কি পাও?’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও গুম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জোয়ার’ প্রদর্শন করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি মো: আবু সাদিক কায়েম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো: শাহিনুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
সভাপতির বক্তব্যে আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় পাওনা হলো, আমরা আমাদের অনেক গুমের শিকার সহযোদ্ধাদের আমাদের মাঝে ফিরে পেয়েছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তার বিপরীত পথে হাঁটছে।
তিনি আরো বলেন, সরকারের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাস কায়েমের মাধ্যমে পূর্বের ‘ফ্যাসিস্ট রেজিমের’ বন্দোবস্ত পুনরায় চালু করতে যাচ্ছে।
আলোচনায় মানবাধিকারকর্মী ও দৃক পিকচার লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা ড. শহীদুল আলম বলেন, ‘আমরা যে বিভীষিকাময় সময় পার করেছি তা যেন আর কখনোই ফিরে না আসে।’ জুলাই বিপ্লবের পর গুম-খুনের সংস্কৃতি আর ফিরে আসবে না বলে আশা করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি অতীতে তার ওপর সংঘটিত নির্যাতনের স্মৃতিও তুলে ধরেন।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক প্রধান নূর খান লিটন বলেন, গুম বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের সমন্বয়ে গুম সংঘটিত হয়েছে। বিগত সময়ে সংঘটিত গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম তার গুমের সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। একইসাথে গুমের শিকার সব ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক নওশীন শর্মিলা রিতু মানবাধিকার ও গুমের ভয়াবহতা নিয়ে বক্তব্য দেন। ডাকসুর এজিএস মুহা. মুহিউদ্দীন খাঁন গুম-ফেরত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সরকার আগের সিস্টেমে দেশকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেটা আত্মঘাতী। সরকার যদি এটা অব্যাহত রাখে, তাহলে এর জবাবও জনগণ দেবে।’
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো: শাহিনুর রহমান তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। একইসাথে এসব পরিবারের প্রতি সরকারের যথাযথ তদারকি না থাকার অভিযোগও করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরাও বক্তব্য দেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস, যিনি রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ, তার বাবা আব্দুল হালিম ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে গুমের শিকার হা. জাকের হুসাইনের বড় ভাই মো: মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার ভাইয়ের লাশ হইলেও আমরা ফেরত চাই। এই অপেক্ষা আর সহ্য করার নয়।’
এ সময় গুম হওয়া রেজোয়ান হোসাইনের ভাই রিপন হোসাইন কান্নাভেজা কণ্ঠে তার ভাইকে ফিরে পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানান।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মো: মাজহারুল ইসলাম, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, বিজ্ঞান সম্পাদক ইকবাল হায়দার এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মো: রাইসুল ইসলাম ও মো: মিফতাহুল হুসাইন আল মারুফসহ ডাকসুর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।



