যৌন হয়রানি, অ্যাকাডেমিক দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত পাঁচ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চার শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) অনুষ্ঠিত ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানি ও অ্যাকাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
চাকরিচ্যুত অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি ও অ্যাকাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। গত বছরের আগস্টে ওই শিক্ষার্থীকে চেম্বারে ডেকে যৌন হয়রানির অভিযোগে তার মা বিভাগের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রভাস কুমারকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়।
তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন ও উচ্চতর তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তার স্থায়ী চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। পরদিন বিষয়টি তদন্তে বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। পরে ৫৩৩তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫৪৫তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তিনি পেনশনসহ কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাবেন না।
২০২২ সালের ২৯ মে অনুষ্ঠিত ৫১৪তম সিন্ডিকেট সভায় পৃথক অভিযোগে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অনুমতি ছাড়া ছুটিতে থাকা এবং ছাড়পত্র ছাড়াই বিদেশে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
অন্যদিকে অধ্যাপক সালমা খাতুনের বিরুদ্ধে সুপারভাইজার ও চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেয়ার অভিযোগ ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করে সিন্ডিকেট।
শিক্ষকদের পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা: রাজু আহমেদও চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত ৫৩১তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তার চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এক কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একইসাথে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।’



