বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা ও ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে ছাত্রদলের একাংশের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। গভীর রাতে মাছের পোনাবাহী গাড়ি আটকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও মারধরের ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক এবং মাছের পোনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতার নাম ঘুরেফিরে সামনে আসছে।
অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত কমিটির শীর্ষ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই দিন দিন মহাসড়কটিতে চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়েই চলছে।
সাধারণ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো: মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মিজানুর রহমানের ছত্রছায়ায় মহাসড়কে এই নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে এবং চাঁদার টাকার ভাগ তাদের পকেটেও যাচ্ছে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) ভোর ৫টার দিকে পটুয়াখালী থেকে আসা চিংড়ির রেনুপোনাবাহী একটি গাড়ি বরিশাল জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে ধাওয়া করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলা রোডে নিয়ে আটকে রাখা হয়। গাড়িটি আটক করার পর বাসের চালক ও হেলপারকে মেরিন অ্যাকাডেমির একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোনার মালিককে ফোন দিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা বিকাশের তিনটি নম্বরে মোট ৯৪ হাজার ৯০০ টাকা পরিশোধ করে গাড়িটি উদ্ধার করেন। বিকাশে টাকা লেনদেনের একাধিক স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
এদিকে প্রথম গাড়িটি আটকে রাখার খবর পেয়ে চিংড়ির রেনুবাহী দ্বিতীয় একটি কালো রঙের হাইএস মাইক্রোবাস বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের জিরো পয়েন্টে পৌঁছায়। সেখানে গাড়িটিকে থামার সিগন্যাল দিলে চালক না থেমে দ্রুত রূপাতলীর দিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একজন ছাত্রদল কর্মী আহত হন।
এরপর ববি ছাত্রদলের ৭-৮ জন নেতাকর্মী মোটরসাইকেল নিয়ে মাইক্রোবাসটির পিছু ধাওয়া করেন। মাইক্রোবাসটি রূপাতলী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে দায়িত্বরত পুলিশের টহল গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, ছাত্রদলের কর্মীরা পুলিশের সামনেই চালক ও হেলপারকে বেধড়ক মারধর শুরু করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। এ সময় হামলাকারীরা মাইক্রোবাসটির গ্লাস ও বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করে। ঘটনায় আহত ছাত্রদল কর্মী মো: আরাফাত ববির ১০ম ব্যাচের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী।
এর আগেও গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কের তালুকদার মার্কেট এলাকায় একই কায়দায় ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও চালককে মারধরের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সে সময় চাঁদাবাজির হাত থেকে বাঁচতে ট্রাকচালক জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করে পুলিশের সহায়তা নিয়েছিলেন।
মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির এই ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল, সহ-সভাপতি মো: মিথুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: স্বজন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইমরান মাহমুদসহ আরো একাধিক নেতাকর্মী। তবে এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নেতাদের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।
আহত ছাত্রদল কর্মী মো: আরাফাত বলেন, ‘আমি ফজরের নামাজ পড়ে ভোর ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি হাইএস গাড়ি এসে আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে আমি পড়ে গিয়ে আহত হই। শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে এখন আমি বাসায় আছি।’
ভুক্তভোগী মাইক্রোবাস চালক বলেন, ‘ওরা প্রথমে একটা মাছের গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যায় এবং টাকা দাবি করে। টাকা-পয়সা দিয়ে সেই গাড়িটি ছাড়া পায়। প্রথম গাড়ি থেকে আমাদের ফোন দিয়ে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যেন গাড়ি না থামাই। তাই আমরা গাড়ি না থামিয়ে টান দেই। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে ৮-১০টি মোটরসাইকেল আমাদের ধাওয়া করে। তাড়াহুড়ো করে আসার কারণে আমরা টোলও দিতে পারিনি। তখন আমার ছেলে ৯৯৯-এ ফোন দেয়। সামনে পুলিশের গাড়ি দেখে ড্রাইভার গাড়ি থামালে, ওরা এসে পুলিশের সামনেই চালক ও আমার ছেলেকে মারধর করে ও গাড়ি ভাঙচুর করে।’
চিংড়ি রেনু উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিক জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার দুটি চিংড়ির রেনুবাহী গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের শিক্ষার্থীরা আটকে চাঁদা দাবি করে। আমি প্রথমে ৯৯৯ এবং সংশ্লিষ্ট থানায় কল করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। পরে আমার কাছ থেকে যারা মাছ কিনেছেন, তারা বাধ্য হয়ে বিকাশে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেন। আরেকটি গাড়ি থেকে চাঁদা নিতে না পেরে তারা গাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং চালককে মারধর করেছে। পরবর্তীতে থানা পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হয়েছে। এসব ঘটনার কারণে ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে চিংড়ি পোনা কিনতে আসতে চান না, ফলে আমরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। জড়িত ছাত্রদল নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে মাইক্রোকার চাপা দেয়ায় বিষয়টি মীমাংসা করতে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পাঁচ নেতা কোতোয়ালি মডেল থানায় গিয়েছিলাম। মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমাদের নাম ব্যবহার করে ছাত্রদলের কেউ যদি এমন অপকর্মে লিপ্ত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় বা অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেব।’
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছেলেকে মোটরসাইকেলসহ একটি হাইএস মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওটিকে ধাওয়া করে। মাইক্রোবাস চালক ৯৯৯-এ কল করে সাহায্য চাইলে পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে আসে। যেহেতু এটি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনা, তাই ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ডেকে বিষয়টি মীমাংসা করে দেয়া হয়েছে এবং মাছের গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
তবে গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটছে না—বিষয়টি আমি বলব না। তবে যেহেতু স্থানটি বন্দর থানার অধীন, তাই সংশ্লিষ্ট পুলিশ এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’



