নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন

সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও পানি ইস্যুতে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান

সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। উভয়পক্ষ সীমান্তে যৌথ টহল, নজরদারি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে একমত হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
নয়াদিল্লিতে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন
নয়াদিল্লিতে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন |সংগৃহীত

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ এবং অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও দাবি তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৮ থেকে ১১ জুন অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বাংলাদেশের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অপরদিকে, ভারতের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীন কুমার, আইপিএস। উভয়পক্ষ আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে।

সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। উভয়পক্ষ সীমান্তে যৌথ টহল, নজরদারি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে একমত হয়।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ও ভারতীয় নাগরিকদের সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ ঘটনার বিষয়ে বিজিবি কঠোর আপত্তি জানায়। বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালার পরিপন্থী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গ্রহণ করা হবে। বিএসএফও অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানায়।

ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য প্রবেশের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে। উভয়পক্ষ মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে সমন্বিত টহল (SCP) জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়।

রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগের জবাবে বিজিবি জানায়, বাংলাদেশ কোনোভাবেই নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভারতে প্রবেশের সুযোগ দেয় না। মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতেও উভয়পক্ষ সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। বাংলাদেশ জানায়, এ ধরনের যেকোনো নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেয়া আবশ্যক। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।

ভারতের মিজোরাম অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। বিএসএফ জানায়, ভারত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয় না এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে।

কুশিয়ারা নদী থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে রহিমপুর খালের খননকাজ দ্রুত সম্পন্নের জন্য ভারতের সহযোগিতা কামনা করে বিজিবি। এছাড়া সীমান্তবর্তী নদীগুলোর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদনেরও আহ্বান জানানো হয়। উভয়পক্ষ এসব বিষয় যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে সম্মত হয়।

সম্মেলন শেষে দু’দেশের মহাপরিচালক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।