চট্টগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে ড. কর্নেল অলি

জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সংস্কার ও বৈষম্য দূর করা

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম) বলেছেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল, আমরা বলেছি-আগে বিচার, সংস্কার ও নতুন সংবিধান।’

চট্টগ্রাম ব্যুরো

Location :

Chattogram
চট্টগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে ড. কর্নেল অলি আহমদ
চট্টগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে ড. কর্নেল অলি আহমদ |নয়া দিগন্ত

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম) বলেছেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল, আমরা বলেছি-আগে বিচার, সংস্কার ও নতুন সংবিধান।’

তিনি বলেন, ‘গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদকে বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে, যার ফলে আজকে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে।’

রোববার (১০ মে) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘গত কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছে। সেখানেও বাংলাদেশ থেকে দীক্ষিত হয়ে, হাসিনার পরামর্শ মতে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করে মমতাকে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। নির্বাচনে জেতার পর থেকে সেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় দেখলাম সেখানে মুসলমানদের গাড়িতে বেঁধে টেনে টেনে নির্যাতন করা হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী চাটুকারদের দ্বারা বেষ্টিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি এসব বেষ্টনী থেকে বের হয়ে জনগণের ইচ্ছার প্রতি ফিরে আসেন। বেগম জিয়া ও জিয়াউর রহমানের মর্যাদা রক্ষা করুন। ইচ্ছা করলেই ক্ষমতায় থাকা যায় না। ক্ষমতায় থাকতে হলে নীতি-নৈতিকতা ও জনগণের সমর্থন প্রয়োজন হয়। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আপনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।’

বিশ্ব তৃতীয় যুদ্ধের দিকে আগাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশে সারসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুনখারাবি বেড়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এসব উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হোন।’

তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। আমি বলবো প্রধানমন্ত্রীকে চিন্তা করতে হবে, তার দলের যে যাই করুক, দায় তাকেই নিতে হবে। দ্রব্যমূল্যের কারণে মানুষের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হলে সরকার সেটি সামাল দিতে পারবে না। বিরোধী দলও আঙুল চুষবে না।’

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, দক্ষিণ জেলা জামায়াতে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিশিষ্ট সংবিধান, আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, জাতীয় নাগরিক পাটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি উপ-প্রধান সরোয়ার তুষার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিততে তার পক্ষে সালাউদ্দিন সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন জায়গায় এমন কথা বলেছেন। কিন্তু উনারা গণভোট অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে বলছেন না কেন? কারণ, বিএনপি জুলাই সনদ জুলাইয়ের স্পিরিট নয়, নিজেদের মতো করে বাস্তবায়ন করতে চান।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি জুলাই সনদে যে ১০টি বিষয়ে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছেন সেগুলোই স্বৈরাচার উৎপাদনের হাতিয়ার। এসব নোট অফ ডিসেন্ট ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যা ভোট দিয়ে খারিজ করে দিয়েছে।’

বল সরকারের কোর্টে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বল এখন জামায়াতের কোর্টে নেই। বল আপনাদের কোর্টে। আপনারা যদি ভুল করেন তাহলে আপনাদের বারেই ঢুকে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন, পাঁচ কোটি মানুষের গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে দেশে নতুন সঙ্কট তৈরি করবেন না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন, তা না হলে যারা অতীতে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বেছে নিয়েছিল, তাদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

অ্যাডেভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থান নেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সঙ্কট তৈরি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী গণভোট জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রয়োগ। অতীতে ১৯৮৫, ১৯৯৬ ও ১/১১ এর সঙ্কট এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করে জনগণের সরাসরি রায় অগ্রাহ্য করা ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। যুক্তরাজ্য, গ্রিস, কলম্বিয়ার নজিরও তাই বলে।’

উদ্বোধনী বক্তব্যে সেমিনারের সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গণভোট জনগণের সরাসরি মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক পদ্ধতি এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে ৭০% ভোটে জয়ী রায় উপেক্ষা করে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে।’

ডি-ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জুলাই গাদ্দার আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ দাবি করে তিনি বলেন, ‘১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালের গণভোটের ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারির রায় মেনে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক মর্যাদা, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন ও মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করে জবাবদিহিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করতে হবে; নতুবা আন্দোলনের মাধ্যমেই জনগণ দাবি আদায়ে বাধ্য হবে।’

এতে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা এমদাদ উল্লাহ সোহাইল, এনসিপির নেতা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর যুগ্ম সমন্বয়ক মীর শোয়াইব ও আরিফ মঈনউদ্দীন, খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম উত্তর জেলা নায়েবে আমির মুফতি শিহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ নেজাম ইসলাম পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পাটির মহানগরীর সভাপতি আবু মোজাফফর মুহাম্মদ আনাস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহানগরীর সভাপতি সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন আলম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মোতালেব, লেবার পার্টির চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ-সভাপতি মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ উল্লাহ, ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস, মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক চসিক মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী প্রমুখ।

এতে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক আহছানুল্লাহ ভুঁইয়া, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য মুহাম্মদ জাফর সাদেক, অধ্যক্ষ আমিরুজ্জামান, খেলাফত আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা আতিক বিন ওসমান, চট্টগ্রাম মহানগরীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, ডা. একেএম ফজলুল হক, ডা. সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ।