মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর : ৪৫ প্রাণের শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছে স্বজনরা

২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ট্রাক উল্টে ডোবায় পড়ে ৪৩ ছাত্রসহ ৪৫ জনের মৃত্যু হয়; ১৫ বছর পরও সেই ভয়াল ট্র্যাজেডির ক্ষত ও স্বজনদের কান্না আজও থামেনি।

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

Location :

Mirsharai
নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ এবং নিহতের ছবি ও নাম
নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ এবং নিহতের ছবি ও নাম |নয়া দিগন্ত

সময় গড়িয়েছে ১৫ বছর। তবুও ২০১১ সালের ১১ জুলাইয়ের দিনটি আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষের জীবনে। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়েছিল ৪৫ পরিবারের স্বপ্নের প্রদীপ। ফুটবল খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে সড়কের পাশের ডোবায় একটি মিনি ট্রাক উল্টে পানিতে ডুবে মারা যায় ৪৩ জন শিক্ষার্থীসহ ৪৫ জন। একসাথে এতগুলো কোমল প্রাণের মৃত্যু শুধু মিরসরাই নয়, স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে।

সেদিন দুপুরে মিরসরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ উপভোগ শেষে গাদাগাদি করে একটি মিনি ট্রাকে বাড়ি ফিরছিল শিশুরা। উপজেলার আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি রাস্তার পাশের ডোবায় পড়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আনন্দমুখর সেই যাত্রা পরিণত হয় হৃদয়বিদারক শোকে।

১৫ বছর পরও অনেক মা সন্তানের স্কুলব্যাগ, বই কিংবা ছবি আগলে রেখে দেন। কেউ এখনো ছেলের ব্যবহৃত পোশাক স্পর্শ করে অশ্রু ঝরান। সন্তান হারানোর সেই বেদনা সময়ের সাথে ম্লান হয়নি। প্রতিবছর ১১ জুলাই এলেই পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্না আর স্মৃতিচারণে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই স্টেডিয়ামে খেলা শেষে বিজয়োল্লাস করতে করতে একটি মিনি ট্রাকে করে আবুতোরাবে ফিরছিলেন শিক্ষার্থীরা। বিকেলে উপজেলার সৈদালী এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে রাস্তার পাশের একটি ডোবায় পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করলেও মিনি ট্রাকের নিচে আটকে পড়া শিশু-কিশোরদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। একে একে উদ্ধার করা হয় ৪৫টি লাশ।

সেদিন ভারী হয়ে উঠে মিরসরাইয়ের আকাশ বাতাস। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো উপজেলা। নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারে স্বান্তনা জানাতে ছুটে আসেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ছুটে আসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশ-বিদেশের নানা মানুষ।

দুর্ঘটনায় আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪ জন, আবুতোরাব ফাজিল মাদরাসার ২ জন, প্রফেসর কামালউদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২ জন, একজন অভিভাবক এবং দু’জন ফুটবলপ্রেমী যুবক নিহত হন। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো মিরসরাইসহ দেশজুড়ে।

নিহত এক শিক্ষার্থীর বাবা নিজাম উদ্দিন বলেন, দেখতে দেখতে আজ ১৫টি বছর পার হয়ে গেল আদরের সন্তানকে হারানোর। স্বপ্ন ছিল নিজের একমাত্র সন্তানকে ডাক্তার বানাবো। কিন্তু ভয়াল ট্র্যাজেডি কেড়ে নিলো স্বপ্ন।

সন্তানহারা এই বাবা জানান, দিবস আসলে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিরা আর স্কুল কর্তৃপক্ষ শুধু ফটোসেশান আর আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ থাকেন। আমাদের খবর কেউ আর নেয় না এখন।

নয়ন শীলের মা বলেন, ‘১৫ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় আজও সেই ১১ জুলাই শেষ হয়নি। প্রতিদিন ঘুম ভাঙলে মনে হয়, আমার নয়ন বুঝি স্কুল থেকে ফিরে এসে ‘মা’ বলে ডাকবে। কিন্তু সেই ডাক আর কোনো দিন শুনতে পাইনি। ও সেদিন বিজয় নিয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল, অথচ ফিরেছিল নিথর দেহ হয়ে। একজন মায়ের বুকের এই শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।’

এদিকে নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’। এবং দুর্ঘটনাস্থল সৈদালীতে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’। প্রতিবছর ১১ জুলাইয়ে এই দুই স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।

দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো অনেক পরিবার আজও সেই দিনের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কারো একমাত্র সন্তান, আবার কারো পরিবারের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সেদিন থেমে যায়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলালেও সেই শোকের ভার এখনো বহন করছেন স্বজনেরা।

স্থানীয় সমাজকর্মী শহিদুল ইসলাম রয়েল বলেন, মিরসরাই ট্র্যাজেডি দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার এক নির্মম উদাহরণ। শিক্ষার্থী পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই নিহতদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে আবুতোরার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে পবিত্র কোরআন খতম, বেলা ১১টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ এবং ‘অন্তিম’ এ পুষ্পস্তবক অর্পণ, সাড়ে ১১টায় শোক সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

মিরসরাইয়ের মানুষের কাছে ১১ জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি এক গভীর ক্ষত, যা সময়ের ব্যবধানে শুকালেও স্মৃতির ভেতর আজও রক্তক্ষরণ ঘটায়। ৪৫টি নিষ্পাপ প্রাণের অপূর্ণ স্বপ্ন আর স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস মনে করিয়ে দেয়- একটি দুর্ঘটনা কত শত জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।