চৌগাছায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামার চরম জনবল সঙ্কটে

যশোরের চৌগাছায় এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ তুলা গবেষণা কেন্দ্র ও বীজ বর্ধন খামারটি চরম জনবল সঙ্কটে ধুঁকছে।

এম এ রহিম, চৌগাছা (যশোর)

Location :

Chaugachha
চৌগাছায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামার
চৌগাছায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামার |নয়া দিগন্ত

যশোরের চৌগাছায় এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ তুলা গবেষণা কেন্দ্র ও বীজ বর্ধন খামারটি চরম জনবল সঙ্কটে ধুঁকছে। বৃহৎ এই খামারটি বছরের পর বছর জনবল সঙ্কটে থাকার ফলে খামারটির সকল কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

খামারটিতে ২৮টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে। যার মধ্যে বর্তমানে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা একজন, সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা একজন, ফোরম্যান একজন, পাম্পম্যান একজন, নৈশপ্রহরী একজন, ড্রাইভার একজন এবং জিন মেকানিক একজন কর্মরত আছেন। এদের মধ্য থেকে দুইজন বেতন এখান থেকে তুললেও কাজ করেন অন্য জায়গায়।

বর্তমানে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ১ জন, ফোরম্যান ১ জন, স্টোর-কাম-ফিল্ডম্যান ১ জন, র‌্যাব/মাঠ সহকারী ১ জন, বৈজ্ঞানিক সহকারী ১ জন, কেয়ারটেকার প্রভোস্ট ১ জন, উচ্চমান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক ১ জন, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর ১ জন, পাম্প ড্রাইভার ১ জন, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ১ জন, অফিস সহায়ক ১ জন, নিরাপত্তা প্রহরী ১ জন, ক্যাটল কিপার ১ জন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জনসহ মোট ১৫টি পদে জনবল শূন্য রয়েছে।

জগদীশপুর তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামারের তথ্য কর্মকর্তার দেয়া তথ্যে জানা যায়, ১৯৮০ সালে এ খামারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। খামারটি বাংলাদেশ সরকার এবং ইইসি (ইইউ)-এর আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

খামারটিতে মোট ৬৩.৭০ হেক্টর (১৫৭ একর) জমি রয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা কাজে ব্যবহার করা হয় ৭ হেক্টর জমি। এ ছাড়া প্রজনন বীজ উৎপাদন ১ হেক্টর, ভিত্তি বীজ উৎপাদন ৩৮ হেক্টর, হাইব্রিড বীজ ১ হেক্টর, সবুজ সারের বীজ উৎপাদন ২০ হেক্টর, ডালজাতীয় ফসল উৎপাদন ৮.১৯ হেক্টর, খেজুর বাগান দশমিক ৬০ হেক্টর, বিভিন্ন গাছের বাগান ৩.১০ হেক্টর, ইমারত আছে ১.৮০ হেক্টর, পুকুর দশমিক ৪০ হেক্টর, রাস্তা ১.৪০ হেক্টর এবং ঔষধি বাগান আছে দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে। তা ছাড়া ১৪.৭২ হেক্টর জমি এখন পর্যন্ত পতিত আছে।

জগদীশপুর তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামারের ব্যবস্থাপক ড. এম জুবায়ের ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘খামারটিতে ৫টি ডিসিপ্লিনের আওতায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগগুলো হলো—প্রজনন বিভাগ, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, কীটতত্ত্ব বিভাগ, মৃত্তিকা বিভাগ ও রোগতত্ত্ব বিভাগ। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে তুলা গবেষণা ও বীজ বর্ধন খামারে জনসংকট কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তাই মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এখানে ডরমেটরির ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে ৮০ থেকে ৯০ জনের থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। বছরে ৩ দিন করে দুইবার বৃহত্তর যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া থেকে আগত কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ ছাড়াও এখানে স্টাফ ট্রেনিং প্রদান করা হয়। জগদীশপুর খামার থেকে তুলার উন্নত জাত সিবি-৫ উদ্ভাবিত হয়েছে, যা উচ্চফলনশীল জাত, যার আঁশের শতকরা হার বেশি, তুলনামূলকভাবে পোকার আক্রমণ কম। এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে বিজ্ঞানী ও মাঠকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে একটি হাইব্রিড তুলার একাধিক জাত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া তুলা ফসলের সারের প্রয়োগমাত্রা উদ্ভাবিত হয়েছে।’

মির্জাপুর গ্রামের তুলাচাষি মিজানুর রহমান জানান, জগদীশপুর তুলা উৎপাদন ও গবেষণা খামার প্রতিষ্ঠার পর তুলাচাষিদের প্রশিক্ষণ ছিল ব্যাপক হারে। স্থানীয় তুলাচাষিদের সঙ্গে খামার কর্তৃপক্ষের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু ধীরে ধীরে তুলা চাষ বন্ধের উপক্রম দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় কৃষকেরা এখন আগের মতো তুলা চাষ করেন না। খামারটির প্রবেশপথসহ খামারের ভেতরের সকল সড়ক এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জনবল না থাকায় খামারে লাখ লাখ টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে অকেজো হয়ে পড়ছে।

উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের বাদেখড়িঞ্চা গ্রামের তুলাচাষি রুহুল আমিন বলেন, শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ হলে খামারটির কার্যক্রমে গতি ফিরে আসবে। এক সময় এই তুলা ফার্মটি দেখতে বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ভিড় করতেন। ফার্মের চারদিকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ছিল। ভেতরে ছিল ফুলের বাগান, রাস্তাগুলোও ছিল সুন্দর। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় যুগে এ তুলা ফার্মে কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি। ফলে বর্তমানে রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তা সংস্কার ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে খামার আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড যশোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাদ্দীদ আল শামীম বলেন, ‘গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বীজ বর্ধন খামারটি বর্তমানে চরম জনবল সংকটে রয়েছে। শূন্য পদগুলোতে জনবল চেয়ে বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে শূন্য পদে লোক নিয়োগ করা হবে। ফলে খামারটির কার্যক্রমে গতি ফিরে আসবে এবং বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের তুলা উৎপাদন সম্ভব হবে।’