কাগজে-কলমে ডিমলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১৭ লাখ টাকার সংস্কার, বাস্তবে সিঁড়িতে শিশুর চিকিৎসা

সরকারি নথিতে প্রায় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার) কাজ শেষ হওয়ার দাবি।

Location :

Dimla
ডিমলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১৭ লাখ টাকার সংস্কার
ডিমলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১৭ লাখ টাকার সংস্কার |নয়া দিগন্ত

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা

সরকারি নথিতে প্রায় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার) কাজ শেষ হওয়ার দাবি।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে অন্তত ১১টি বেড অকেজো, নতুন বসানো টাইলস উঠতে শুরু করেছে, একাধিক কক্ষে রং অসম্পূর্ণ, ভাঙা দরজা, অপর্যাপ্ত আলো এবং সামান্য বৃষ্টিতেই বারান্দায় পানি জমে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। শয্যা না পেয়ে চার মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে নিয়ে এক মা হাসপাতালের সিঁড়িতে বসেই রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের টেন্ডার, নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড, চুক্তিপত্র ও বিল অব কোয়ান্টিটিজে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৯ টাকা ৫৯ পয়সা ব্যয়ে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের সংস্কারকাজের কার্যাদেশ দেয়া হয় মেসার্স খন্দকার এন্টারপ্রাইজকে। কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ৬০ দিন। টাইলস, রং, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটারি ফিটিংস, গেট, দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের উল্লেখ থাকলেও বাস্তব চিত্রে সেই উন্নয়নের পূর্ণ প্রতিফলন মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার (২ আগস্ট) দিবাগত রাতে দক্ষিণ গয়াবাড়ী এলাকার মোছা. রিফা আক্তার চার মাস বয়সী কন্যা তাসফিয়া জান্নাতকে রক্তে সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে আসেন। কিন্তু কোনো শয্যা খালি না থাকায় বারান্দায় চিকিৎসা শুরু করতে হয়। পরে বৃষ্টিতে বারান্দা ভিজে যায় এবং সেখানে পানি জমে। বাধ্য হয়ে তিনি অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের সিঁড়িতে আশ্রয় নেন।

রিফা আক্তারের প্রশ্ন, ‘সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি অসুস্থ শিশুকে নিয়ে সিঁড়িতে বসে থাকতে হয়, তাহলে এত টাকার সংস্কারের সুফল কোথায়?’

সরেজমিনে আরো দেখা যায়, নারী ওয়ার্ডের ৬টি ও পুরুষ ওয়ার্ডের ৫টি বেড দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। জিন এক্সপার্ট কক্ষের দরজা ভাঙা, রান্নাঘরসহ কয়েকটি কক্ষে রং অসমাপ্ত, প্রধান ফটকে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই এবং বৃষ্টির সময় বারান্দায় পানি জমে রোগী ও স্বজনদের চলাচল ব্যাহত হয়।

উপজেলার উকিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোকছেদ আলী এক মাস বয়সী নাতনিকে নিয়ে টানা দুই দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পাব এই আশায় এসেছিলাম। কিন্তু ভাঙা ও অকেজো বেডের কারণে একটি শয্যাও পাইনি। বাধ্য হয়ে অসুস্থ নাতনিকে নিয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। রাতে বৃষ্টি হলে বারান্দায় পানি ঢুকে পড়ে। তখন নাতনিকে কোলে নিয়ে তিন-চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এমন দুর্ভোগ কোনো রোগীর স্বজনের কাম্য হতে পারে না।’

শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মাকে নিয়ে ভর্তি হওয়া আলাল উদ্দিন বলেন, ‘সংস্কারের কথা কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে রোগীরা মৌলিক সুবিধাও পাচ্ছেন না। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও) ডা: রাশেদুজ্জামান রাশেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংস্কার ও মেরামতের কাজ যথাযথভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে আপনি যেসব বিষয় তুলে ধরছেন, সেগুলো আমার জানা তথ্যের সাথে পুরোপুরি মিলছে না। তবুও বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সমাধানের চেষ্টা করব।’

এ বিষয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও) ডা: আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কার্যাদেশ না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। সংস্কার ও মেরামতের কাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করে না; স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর তা বাস্তবায়ন করে। একটি কার্যাদেশে সব ধরনের কাজ একসাথে থাকে না, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কাজ করা হয়।’

ঠিকাদার শাহ মো: মনসুর রহমান এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনি কুমার শর্মার বক্তব্য জানতে একাধিক যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা নয়া দিগন্তের প্রতিবেদকের ফোন ধরেননি।

নীলফামারীর উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিতাই চন্দ্র বর্মন বলেন, ‘বিলের বিষয় ডিভিশন অফিস দেখে। কাজ চলাকালীন আমি কয়েকবার গিয়েছি। ইউএইচঅ্যান্ডএফপিওকে দিয়ে কাজ করিয়েছি এবং প্রায় ১৮ লাখ টাকার হিসাব বুঝিয়ে দিয়েছি।’