খালিয়াজুরীতে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির অভিযোগ

উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের বিশুরীকান্দা এলাকায় স্থানীয় ২৪টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় মাছ ধরতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি জেলেদের বাধা দিয়ে মাছ ধরতে হলে টাকা দেয়ার দাবি করেন।

Location :

Netrokona
খালিয়াজুরী থানা
খালিয়াজুরী থানা |নয়া দিগন্ত

খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের মারধর, মাছ ধরতে বাধা এবং জাল, নৌকা ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় খালিয়াজুরী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলরামপুর গ্রামের জেলে মো: মুজিবুর মিয়া।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের বিশুরীকান্দা এলাকায় স্থানীয় ২৪টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় মাছ ধরতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি জেলেদের বাধা দিয়ে মাছ ধরতে হলে টাকা দেয়ার দাবি করেন। পরে দুই নৌকার জেলেরা আল আমিন চৌধুরী ও আলী হোসেনকে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে আরো ৭০ হাজার টাকা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন তারা।

অভিযোগকারীদের দাবি, গত ২৬ আগস্ট রাত ৯টার দিকে ১৮ জন জেলে দু’টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে বিশুরীকান্দা এলাকায় মাছ ধরতে গেলে আল আমিন ও আলী হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি আগের এক লাখ টাকার পাশাপাশি আরো দুই লাখ টাকা দাবি করেন। এতে জেলেরা আপত্তি জানিয়ে আগের টাকা ফেরত চান। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটির মধ্যে তাদের মারধর করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, জাল ও দু’টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

অভিযোগে দু’টি নৌকার আনুমানিক মূল্য দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং নগদ টাকা ও মোবাইলসহ অন্যান্য মালামালের মূল্য প্রায় ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী জেলে মো: মুজিবুর মিয়া বলেন, ‘আমরা মাছ ধরে পরিবার চালাই। মাছ ধরতে গেলেই বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হয় এবং টাকা দাবি করা হয়। ঘটনার রাতে আমাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করার পাশাপাশি নৌকা, জাল ও মোবাইল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা চাই।’

আরেক জেলে শহীদুল্লাহ বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে তারা আগের এক লাখ টাকা দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা নগদ দেয়া হয়েছিল এবং বাকি ৭০ হাজার টাকা দেয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু ২৬ আগস্ট রাতে মাছ ধরতে গেলে নতুন করে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মারধর করে টাকা, মোবাইল, নৌকা ও জাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।’

অভিযোগ অস্বীকার করে আল আমিন চৌধুরী জানান, তিনি আগরডুবি জলমহালের অংশীদার এবং আলী হোসেন মূল মালিক। জেলেদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ওই এলাকায় মাছ ধরতে নিষেধ করা হলেও জেলেরা তা না মেনে মাছ ধরছিলেন। এ কারণে তাদের জাল, দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও কয়েকটি মোবাইল নিয়ে আসা হয়েছে।’

পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন এবং জেলেরা এলে নৌকা ও মালামাল ফেরত দেয়ার কথা বলেছেন।

অভিযুক্ত আলী হোসেনও চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আগরডুবি জলমহালটি সাতগাঁওয়ের শফিকুল মেম্বারের এবং তিনি সেটি দেখাশোনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে বলরামপুরের জেলেদের ওই এলাকায় মাছ ধরতে নিষেধ করা হলেও তারা তা মানেননি। এ কারণে নৌকা, জাল ও মোবাইল নিয়ে আসা হয়েছে। এগুলো ফেরত দেয়া হবে বলেও তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো: রইছ তালুকদার বলেন, ‘অভিযুক্তরা জেলেদের জাল ও মোবাইল নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। আগরডুবি বিলটি আগে সাতগাঁওয়ের অলিদ মাস্টার ও শফিকুল মেম্বারের প্রজেক্ট ছিল। পরে বানুয়ারী গ্রামের আল আমিন ও আলী হোসেনরা সেটি জমা নেন। জেলেদের কাছ থেকে মাছ ধরার জন্য টাকা নেয়া হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান বলেন, ‘উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরতে কোনো বাধা নেই। তবে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরার জন্য কোনো ধরনের চাঁদা দেয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়মিত মামলা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। শাস্তির বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করবে।’

খালিয়াজুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিশুরীকান্দা জলাশয়টি ইজারাভুক্ত কি না, তা এসিল্যান্ড কার্যালয় থেকে জানা যাবে। খালিয়াজুরীতে মাছ ধরার ওপর এক মাসের নিষেধাজ্ঞা ছিল, বর্তমানে তা নেই। তবে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। বেড় জাল দিয়ে মাছ ধরার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘জলাশয়ের নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে কয়েকগুণ এলাকা পর্যন্ত জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেয়া কাম্য নয়। কোনো জলমহাল ইজারা দেয়া হলে যার নামে ইজারা দেয়া হয়, আইন অনুযায়ী তিনিই সেখানে মাছ ধরতে পারবেন। অন্য কারো কাছে সাব-লিজ দেয়ার কোনো বিধান নেই।’

খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: নাসির উদ্দিন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ঘটনাটি তদন্তের জন্য উপ-পরিদর্শক মঞ্জুরকে পাঠানো হয়েছে। জেলেদের দু’টি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ অন্য মালামাল ফেরত দেয়ার কথা বলা হয়েছে। মালামাল ফেরত না দিলে কিংবা অভিযোগকারীরা মামলা করতে চাইলে আইন অনুযায়ী মামলা নেয়া হবে।’