রাজবাড়ীতে বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্কে সাধারণ মানুষ, মিলছে না ভ্যাকসিন

বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুক্তভোগী বেশীরভাগই শিশু। এ ছাড়া কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না হাঁস-মুরগি, ছাগল, ভেড়াসহ অন্য গবাদিপশু।

মেহেদুল হাসান আক্কাস, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

Location :

Rajbari
বেড়েছে কুকুরের উৎপাত
বেড়েছে কুকুরের উৎপাত |নয়া দিগন্ত

আদালতের নিষেধাজ্ঞায় দেশে কুকুর নিধন নিষিদ্ধ থাকায় প্রতিবছর রাজবাড়ীতে বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করা শিশু শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। সরকারি হাসপাতালে মিলছে না ভ্যাকসিন। কুকুরে কামড়ানো ভুক্তভোগীদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়। এতে করে জনমনে দেখা দিয়েছে জলাতঙ্ক রোগ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির শঙ্কা।

বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপদ্রব ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুক্তভোগী বেশীরভাগই শিশু। এ ছাড়া কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না হাঁস-মুরগি, ছাগল, ভেড়াসহ অন্য গবাদিপশু।

রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমেপ্লেক্স ও স্থানীয়দের তথ্য মতে জানা যায়, এ জেলায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক গৃহপালিত পশু কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া অসংখ্য হাঁস মুরগী খেয়ে সাবার করে থাকে। কখনো কখনো কুকুরের কামড়ানো পশুর চিকিৎসা দিতে না পারায় মারা যাওয়ার ভয়ে জবাই করে গোপনে গোশত বিক্রি করা হয়।

প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগামী শিশু কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু জেলার কোনো সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কুকুর, বিড়াল বা হিংস্র পশু কামড়ানো প্রতিষেধক ইনজেকশন বা ভ্যাকসিন নেই। বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় আক্রান্ত হওয়া লোকজনকে চড়ামূল্যে ভ্যাকসিন কিনতে হয়।

চিকিৎসা তথ্যমতে জানা যায়, কুকুরের কামড়ের আক্রান্ত হলে দুই থেকে তিনটি ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে আক্রান্তদের ভ্যাকসিন নিতে যেতে হচ্ছে জেলা সদর হাসপাতালে। বর্তমানে জেলা হাসপাতালেও সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে ভুক্তভোগীরা যেমন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন তেমনি গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকার মোড়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বারান্দায়, বিভিন্ন খোলা স্থাপনার ছাঁদের নিচে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো অবস্থান করে। আট থেকে ১০টি কুকুর দল বেঁধে রাস্তায় ও বাড়িঘরের আঙিনায় চলাচল করে। সুযোগ পেলেই মানুষের বাড়িতে পোষা হাঁস-মুরগি, ছাগলের বাচ্চা ধরে নিয়ে যায়। ওদের ধাওয়া করলে উল্টো মানুষকে আক্রমণ করে। কুকুরের আক্রমণে মানুষসহ বিভিন্ন পশু ও প্রাণী আক্রান্ত হয়। শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে সাহস পায় না। ভোর বেলা মুসল্লীরা মসজিদে যাওয়ার সময় রাস্তায় শুয়ে থাকা সংঘবদ্ধ কুকুরগুলো তাদের আক্রমণ করে।

এ সময় গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণী সম্পদ হাসপাতালে কুকুরে কামড়ানো ছাগল নিয়ে আসা লাভলী বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আক্রান্ত হলে হাসপাতালে নিয়ে এলে তারা ইনজেকশন লিখে দেয়। বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। আমি গরীব মানুষ, টাকা নাই। তাই ছাগল বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। টাকা যোগাড় হলে ইনজেকশন দেব।’

গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে কুকুরের কামড়ানোর প্রতিষেধক ইনজেকশনে সরবরাহ নেই। প্রতিদিন তিন থেকে চারটি করে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ছাগল গরু আনা হয়। চিকিৎসা দিয়ে থাকি কিন্তু কোনো ফ্রি ইনজেকশন দিতে পারি না।’

এ ছাড়াও কুকুরে কুকুরে মারামারি করে আহত হওয়া কিছু কুকুর শরীরে পচনধরা ক্ষত নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এতে রোগ জীবাণু আর দুর্গন্ধে বিভিন্ন সংক্রমণ রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ সব কুকুরের উৎপাতে পথ চলতে পথিকেরা বিড়ম্বনায় পড়েন। বেওয়ারিশ এসব কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন এর উপদ্রব বেড়েই চলছে। সরেজমিন ঘুরে, রাজবাড়ী গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দী, কালুখালী, পাংশা এলাকা ঘুরে একই তথ্য পাওয়া যায়। গোয়ালন্দ পৌরসভার ওলিমদ্দিন পাড়া, চরবালিয়াকান্দী মসজিদের পাশে, বাড়ই ডাঙ্গা স্কুল মাঠ, ছোট ভাকলা মৌলভীবাজার, বালিয়াকান্দী বাজার, পৌর জমতলা বাজার, জমিদার ব্রিজ, দৌলতদিয়া বাজার, কাটাখালী বাজার, উজানচর জামতলা বাজারসহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় দলবদ্ধ কুকুর ঘুড়াঘুড়ি করতে দেখা যায়।

গোয়ালন্দ পৌর ১ নম্বর ওয়ার্ডের ওলিমদ্দিন পাড়ার স্কুলছাত্রী তাবাসসুম আক্তার, আব্দুল্লাহ সরদার, আবির প্রামানিক, তুরাগ প্রামানিকসহ অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী জানায়, সকাল বেলা একা একা স্কুল ও প্রাইভেট পড়তে যেতে খুব ভয় লাগে। এ ছাড়াও মাঝে মাঝে কুকুরের দল একা পেলে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসে।

পাংশা পৌর বাজারের ডেকোরেশন ব্যবসায়ী আব্দুল রশিদ বেপারী জানান, কুকুরের ভয়ে রাতে একা একা বাড়িতে যাওয়া যায় না।

বিভিন্ন এলাকার মসজিদগামী মুসল্লী হারুন সরদার, মোতালেব প্রামানিক, মিলন মন্ডল, কালাম সরদার, মোবারক মোল্লাসহ মুসুল্লিরা বলেন, প্রতিদিন লাঠি হাতে নিয়ে মসজিদে যাতায়াত করি। ভোরে বাড়ি থেকে ফজরের নামাজে মসজিদে যাওয়ার সময় আট থেকে ১০টি কুকুর রাস্তার মাঝে শুয়ে থাকে। লাঠি দিয়ে তাড়া করলেও সরে না। উল্টো সবগুলো কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করে এগিয়ে আসে। একা থাকলে ভয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হই।

দৌলতদিয়া ঘাটের ওষধ ব্যবসায়ী আব্দুল হাই জানান, রাতে বাড়ি ফেরার সময় কুকুরগুলো পথ রোধ করে ধরে। এ কারণে একজন সঙ্গীর অপেক্ষায় থাকতে হয়।

তিনি আরো জানান, ছোট ছোট শিশুরা মক্তবে যেতে পারছে না। এমনকি শিশুদের হাতে কোনো খাবার থাকলে বা দেখলে তেড়ে আসে। কুকুর আমার অনেকগুলো মুরগি খেয়ে ফেলেছে।

রাজবাড়ী জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কুকুর নিধন না হওয়ায় বর্তমানে কুকুরের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় লোকজন, ছাগল, হাঁস-মুরগিতে কুকুর কামড়ায়। কিন্তু জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফ্রি ভ্যাকসিন বা ইনজেকশন পাওয়া যায় না। অনেক গরীব মানুষ টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারে না। এতে ভবিষ্যতে জলাতঙ্ক রোগ দেখা দেয়ার স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে।’

জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা: প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে নিরীহ প্রাণীকে হত্যার বিষয়টি মানবতা পরিপন্থি হিসেবে উচ্চ আদালত কুকুর নিধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে গৃহপালিত পশু ও মানুষকে কুকুরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সচেতন থাকতে হবে।’

রাজবাড়ী জেলা স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিভিল সার্জন ডা: এস এম মাসুদ জানান, কুকুর নিধন নিষিদ্ধ থাকায় এ জেলায় কুকুরের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কুকুরকে লাইগেশন ও ভ্যাসেকটমি পদ্ধতি ব্যবহার করে কুকুরকে বন্ধাত্বকরণ করে কুকুরের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখা যেতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কুকুরে কামড়ানো অনেক রোগীকে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়। সরকারি ভাবে ফ্রি ইনজেকশন বা ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় চিকিৎসাপত্র লিখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।’