বিগত কয়েকদিনের মৌসুমী বৃষ্টিতেই গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পৌরসভার কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। চার দিন থেমে থেমে বৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা দূর হয়নি। এতে স্থানীয় কয়েক শ’ পরিবার অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
অপ্রতুল স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সংকট, খাদ্য সংকট, বসবাসের জায়গা সংকট, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সমস্যা, কর্মজীবী নারী ও পুরুষদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অর্থমূল্যেও এ ক্ষতির পরিমাণ কম নয়।
এসকল সংকটের জন্য ভুক্তভোগীরা স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলাকে দায়ী করছে। অপরদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, জনদুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর পর্যন্ত ওইসব এলাকার জলাবদ্ধতা কাটেনি।
পানিবন্দী এলাকাগুলো হলো কালিয়াকৈর পৌরসভার হরিণহাটি, হাবিবপুর, বিশ্বাসপাড়া, রূপনগর, শিয়ালপাড়া, পূর্ব চান্দরা ছাপড়া মসজিদ সংলগ্ন, হরতকিতলা, পূর্ব চান্দরা জোড়া পাম্প এলাকা এবং বিশ্বাসপাড়া এপেক্স কারখানার পেছনে।
পানিবন্দী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার (১৫ জুন) ভোরে তিন ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ এলাকায় পানি আটকে থাকে। অনেকের ঘরবাড়িতে হাঁটু ও কোমরসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সড়ক যোগাযোগ। এতে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে পড়া অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু সড়কে।
পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে পানি সরে যেতে সময় লাগছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ওইসব এলাকার বিভিন্ন সড়ক, বাড়ির আঙ্গিনা এবং নিচু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। নিরাপদ খাবার পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিয়েও সংকটে পড়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার দখল এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। বৃষ্টির চার দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় পানি নামেনি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সফিপুর-হরিণহাটিসংলগ্ন এলাকাগুলো।
পূর্ব চান্দরা ছাপড়া মসজিদসংলগ্ন এলাকার এক বাসিন্দা পোশাক শ্রমিক আওলাদ বলেন, ‘চার দিন যাবত ঘরে পানি। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। কর্মস্থলে যেতে পারছি না। আজ চার দিন যাবত স্ত্রী ও ছোট বাচ্চা রেখে অফিসে যেতে পারতেছি না। চাকরিটা মনে হয় আর থাকবে না।’
হরিণহাটি এলাকার গৃহিনী নাজমা বলেন, ‘বৃষ্টির পানি জমে ঘরে কোমরসমান পানি। আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। খুব কষ্ট করে ঘরে থেকে বের হয়ে বাচ্চার বাবা বাজার থেকে রাতে শুকনা খাবার নিয়ে আসছিল। সেগুলো খেয়েই উঁচু সড়কের মধ্যে কোনো রকমে রাত পার করতেছি। পানি নামারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’
হরতকিতলা এলাকার সোলেমান জানান, অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত ড্রেনের ব্যবস্থার কারনে পানি যেতে পারছে না। এর কারণে চার দিন ধরে ঘরে পানি। নিজেরা বাঁধ দিয়ে সেচে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া এবং কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থলে যাতায়াতে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
রূপনগর এলাকার বাসিন্দা পোশাকশ্রমিক মুসা বলেন, ‘অল্প বৃষ্টি হলেই এসব এলাকায় পানি জমে। টানা তিন ঘণ্টা মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় পানি জমে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। চার দিনেও পানি নামেনি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর পানি ঢুকে মালামালের ক্ষতি হয়েছে। রাস্তায় পানি থাকায় ক্রেতারাও আসতে পারছেন না। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ দ্রুত স্থায়ী সমাধান চার তারা।
তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার কথা জানানো হলেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করে পানি ঢুকে পড়ায় লাখ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও ডাইং কারখানার দূষিত পানি, আবর্জনা ও মলমূত্র পানির সাথে ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। অনেক কারখানার শ্রমিক কোমরপানি মাড়িয়ে কাজে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মীরা পানি নিষ্কাশনের কাজ করছেন। পৌরসভার খালগুলো পানি ধারণক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না। কয়েকটি স্থানে ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় পানি কমতে শুরু করেছে। নিচু স্থানে বাড়ি নির্মাণ এবং ড্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা না রাখায় পানি নামতে সময় লাগছে। প্রশাসনের একাধিক দল পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করছে। আশা করা হচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নেমে যাবে। ভরাট হয়ে যাওয়া ড্রেন ও খাল খননের উদ্যোগও নেয়া হবে।



