সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণে বনবিভাগের অভিযানে এক বছরে আটক ৪৯৪

জনবল নিয়োগের বিষয়টি আমাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত করছে। নৌযানসহ অন্যান্য সমস্যা প্রকট। আমরা নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দিয়ে থাকি। তবে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আসে না।

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা)

Location :

Khulna
ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন
ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন |নয়া দিগন্ত

সীমিত জনবল নিয়ে সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অনুমোদিত জনবলের এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে চলছে বন পাহারা দেয়ার কাজ। তবে নানা সঙ্কটের মধ্যেও মামলা, জব্দ ও আসামি আটকের সংখ্যা আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অভয়ারণ্য এলাকায় ৩৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ নিয়ে বিগত বছরে নিষিদ্ধ এলাকায় মোট ৮৮টি মামলা হয়েছে। ২০২৫-২৬ বছরে ১৭৪ জন আসামিকে আটক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বড় চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া এ সময়ে ১২২টি নৌকা ও ১৬টি ট্রলার জব্দ করা হয়।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: শরিফুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের মোট অভয়ারণ্য এলাকার গুরুত্বপূর্ণ চারটি পয়েন্ট খুলনা রেঞ্জের মধ্যে। এসব এলাকায় অবৈধ মাছ ব্যবসায়ী ও শিকারিদের নজর থাকে বেশি। ফলে জনবল, নৌযানসহ বিভিন্ন সঙ্কটের মধ্য দিয়েই অভিযান পরিচালনা করতে হয়। বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত উপকরণ জব্দের পরিমাণও বেড়েছে।

চলতি বছরের তিন মাস ও বিগত এক বছরে নিষিদ্ধ এলাকায় অভিযানে জেলে আটক, নৌকা জব্দ করা হয়েছে অধিক সংখ্যক। এ সকল বিষয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে নীলকমল ফাঁড়িতে ২৫টি, পাটকোষ্ঠা ফাঁড়িতে ২২টি, ভোমরখালী ফাঁড়িতে ২৫টি ও কাগাদোবেকী টহল ফাঁড়িতে ১৬টি ট্রলার জব্দ করা হয়েছে।

অপরদিকে ২০২৪-২৫ সময়ে মোট ২৭৪টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ৪৯৪ আসামি আটক হয় এবং ৪৫ জন পলাতক রয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ১৯১টি নৌকা, ৩৪টি ট্রলার, এক হাজার ৩০৫ ঘনফুট কাঠ, এক হাজার ৫৫০ কেজি মাছ, এক হাজার ৫২৯ কেজি কাঁকড়া ও ৩৯ কেজি মধু। এছাড়া বিপুল পরিমাণ হরিণ ধরার ফাঁদ জব্দ, গোশত উদ্ধার, অবৈধ ২৪০টি বিষের বোতল ও জালসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো: মাহবুবুর রহমান জানান, নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে অপরাধ দমনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে এত সঙ্কটের মধ্যে একটি বিভাগ কিভাবে চলছে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের উচিত সেটা নিয়ে অনুসন্ধান করা এবং সেসব সমস্যা সমাধানের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।

সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সর্বশেষ প্রান্তের টহল ফাঁড়ি নীলকমলের অফিসের স্টাফ মো: নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু নীলকমলের আন্ডারে দুই শ’র মতো খাল রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের একটি বিশাল এরিয়া টহল দিতে হয় আমাদের। অথচ আমাদের দ্রুতগতির ও ভারী কোনো নৌযান নেই।

খুলনা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে অপরাধ দমনে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এটি চলমান রাখা হবে।

জানা গেছে, সুন্দরবন বিভাগের এক হাজার ১৯০টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৩২৩টি। সবচেয়ে বেশি শূন্য রয়েছে ফরেস্ট ও ডেপুটি রেঞ্জার, ফরেস্টার, সারেং, নৌকাচালক ও ইঞ্জিনম্যান পদ।

বিশেষজ্ঞ ও বনসংশ্লিষ্টদের অভিমত, জনবল সঙ্কটে কার্যত সুরক্ষা পাচ্ছে না ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। জনবল অপ্রতুল হলেও নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা অপরাধ দমনে চেষ্টা করছেন বলে বন কর্মকর্তারা জানান।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম শ্রেণির মধ্যে উপবন সংরক্ষকের তিনটি পদের মধ্যে একটি ও সহকারী বন সংরক্ষকের আটটি পদের মধ্যে তিনটি শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে ফরেস্ট রেঞ্জারের ৩০টি পদের ২৭টিই শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে মেকানিক্যাল সুপারভাইজারের একটি পদের একটি, ফোরম্যানের দু’টি পদের মধ্যে দু’টি, ইঞ্জিন ড্রাইভারের ৩১টি পদের ১৪টি, হিসাব রক্ষকের তিনটি পদের একটি, ডেপুটি রেঞ্জারের ৪৫টি পদের ৪৫টি, উচ্চমান সহকারীর তিনটি পদের একটি, ফরেস্টারের ১০৮টি পদের ৪৩টি, সারেংয়ের ১৭টি পদের ১৩টি পদ শূন্য। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণির মধ্যে ১২৩টি পদে নৌকাচালকসহ অন্তত ১৬০টি পদ ফাঁকা রয়েছে।

সুন্দরন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, জনবল নিয়োগের বিষয়টি আমাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত করছে। নৌযানসহ অন্যান্য সমস্যা প্রকট। আমরা নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দিয়ে থাকি। তবে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আসে না। তার পরেও সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।