সরকারি খালে অবৈধ স্থাপনা : হাতিয়ায় পৌরসভাসহ ৮০ গ্রাম জলাবদ্ধ

প্রশাসনের সামনে দিন দিন গড়ে উঠা এ খালের উপর এসব স্থাপনা গড়ে উঠার কারণে জলাবদ্ধতার মূল কারণ বলে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।

ইফতেখার হোসেন, হাতিয়া (নোয়াখালী)

Location :

Hatia
হাতিয়ার জলাবদ্ধ একটি এলাকা
হাতিয়ার জলাবদ্ধ একটি এলাকা |নয়া দিগন্ত

টানা ছয় দিনের ভারি বর্ষণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এখনো ৮০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে। খালগুলোতে জোয়ারের পানির সাথে ভারী বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতার। এতে পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের এখনো পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটছে।

হাতিয়া পৌরসভার প্রায় ওয়ার্ডের খালগুলো সংস্কারের অভাবে জলাবদ্ধতায় শিকার হয়ে পড়েছে বাসিন্দারা। উপরন্তু উপজেলা সদরে মার্টিন খালের উপর গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। প্রশাসনের সামনে দিন দিন গড়ে উঠা এ খালের উপর এসব স্থাপনা গড়ে উঠার কারণে জলাবদ্ধতার মূল কারণ বলে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।

পৌরসভার ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘উপজেলা সদরে মার্টিন খালের উপর প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে দোকান ঘর, প্রাইভেট হাসপাতাল, মার্কেট নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। এতে পৌরসভার ছয়টি ওয়ার্ডে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।’

দ্রুত খাল সংস্কার করে পানি নিষ্কাশনের দাবী ভুক্তভোগীদের।

এদিকে, উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলসহ প্রায় ৮০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক ও স্থানীয় বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে কার্যত ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা।

এখানে অনেক পরিবারের রান্নার চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না।

টানা বৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে কৃষকের আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। মাছের ঘের ও পুকুর উপচে মাছ ভেসে গেছে। দ্রুত পানি না নামলে সবজি ফসলের মারাত্নক সংকট দেখা দেয়ার সম্ভাবন রয়েছে। অন্যদিকে আগাম আমন মৌসুমের চাষাবাদে বীজতলা নষ্ট হওয়ার অর্থনৈতিক লোকসান গুনতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় হাতিয়ার অধিকাংশ এলাকায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। খাল ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। এবার আষাঢ়ের টানা ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

সামনের দিনগুলোতে আরো বৃষ্টিতে দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

জাহাজমারা ইউনিয়নের মেকপাশ্বান গ্রামের বাসিন্দা মদিনুল হক বলেন, ‘গরু, ছাগল ও মহিষের চারণভূমিতে এখন নৌকা চালিয়ে চলাচল করছে গ্রামের ছেলেরা। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে বাড়ির চারপাশে পানি জমে আছে। অনেকের ঘরে পানি ঢুকে গেছে। চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না করা যাচ্ছে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।’

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের কৃষক সাহেদ উদ্দিন বলেন, ‘আমার পুরো বীজতলা পানির নিচে। পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। এখন নতুন করে চাষাবাদ কীভাবে করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

দ্বীপবাসী প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ভোগ দুর্গতির পুনরাবৃত্তি হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

জলাবদ্ধতায় কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সরকারি সহায়তারও দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, ‘সরকারি খালের উপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে।’

অনেক জায়গায় শুকনো খাবার ও সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।