বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, ‘আমরা নতুন শাসন ব্যবস্থা চাই, গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন চাই। ম্যাকানিজম করে ক্ষমতায় গিয়ে তারা গণভোটের রায় ভুলে গেছেন।’
তিনি বলেন, ‘সংসদে একজন অবৈতনিক শিক্ষক আছেন, যিনি সংসদে প্রায়ই সংবিধান শেখান। প্রতারণা করলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকুন। আপনারা ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন। এটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।’
শনিবার (১৮ জুলাই) বেলা ২টায় বরিশাল নগরীর কেন্দ্রীয় হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ মাঠে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ‘ভাঙার পরে পুরো রাস্তা ভাঙা, ভোলাবাসীর ন্যায্য দাবি ব্রিজ দিতে হবে, রেললাইন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অধিকার। বরিশালকে বঞ্চিত রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন হবে না। যেখানেই বৈষম্য সেখানেই আমরা আওয়াজ তুলব।’
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আবার গর্জে উঠব, অধিকার আদায় করেই ছাড়ব। ভুল পথ থেকে ফিরে আসুন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন। ২৫ জুলাই সিলেটে সমাবেশের আগেই গণভোটের রায় মেনে নিন, নচেৎ ঢাকায় মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের সাথে আর কত ধোঁকাবাজি করবেন, প্রয়োজনে নতুন বাংলাদেশ গড়ব। জুলাই আন্দোলনে অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে তবুও মাথা নত করেনি। আসল ফ্যাসিবাদকে যখন জনগণ পাত্তা দেয়নি, ডামি ফ্যাসিবাদকেও দেবে না। জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তারা চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের সাফ কথা—যেখানে জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে, সেটা যদি না মানেন তাহলে আপনাদের সরকার হিসেবে মানা হবে না।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা রাজপথে থাকতে চাই না। আমরা সবাই একসাথে কাজ করতে চাই। আমরা রক্তে আগুন লাগাতে চাই না। আর পরীক্ষা নেবেন না। আমাদের সন্তানরা পরীক্ষিত। চব্বিশের (২৪) ঐতিহ্যের কথা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। জনগণের রায়ের ভোটে আপনারা সম্মান প্রদর্শন করুন। বৈষম্য আমরা মেনে নেব না। সময় থাকতে ভালো হয়ে যান। তেলের দাম, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সকল কিছুর দাম বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়িয়ে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছেন। হাতে চিড়া-মুড়ি নিয়ে আবারও লড়াই করতে হবে অধিকার আদায়ের জন্য।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি, নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। যারা নির্বাচনের আগে ওয়াদা দেন একরকম আর কাজ করেন ভিন্ন, তারাই মুনাফিক। বরিশালের উন্নয়নে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরায় প্রধান অতিথি ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের প্রতি বরিশালবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।’
তিনি বলেন, ‘আজকে প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আপনারা সমাবেশে হাজির হয়েছেন। মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সকল রাস্তা লোকে টইটুম্বুর। দেশবাসীর প্রত্যাশা এই দেশে আর ফ্যাসিস্ট আর চাঁদাবাজ সৃষ্টি হবে না। আমরা ভোলা-বরিশাল সেতু চাই, ছয় লেনের সড়ক চাই, গ্যাস লাইন চাই। এসব দাবি পূরণ করতে হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মুখে মধু, অন্তরে ছলনা। তিনি গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট চেয়েছেন আর এখন উল্টে গেছেন। ৫ আগস্টের পর তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে চলে গেছেন। এখন তারা ৩১ দফার কথা বলেন না, তারা সংস্কারের কথা অস্বীকার করে এখন সংশোধনের কথা বলছেন। ৩১ দফার প্রথম দফাই ছিল সংস্কার, আর এখন তারা বলছেন উল্টো কথা। তাই প্রধানমন্ত্রীকে বলছি—নাটক কম করেন পিও। সাধারণ মানুষের কোনো কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি, বরং দলীয় কর্মীদের চাঁদাবাজি নিশ্চিত হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা শেখ হাসিনার বিচারসহ সুশাসন নিশ্চিত করব।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি কখনোই গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল না। তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করছে। আমরা প্রয়োজনে আবার নির্বাচনের দাবি উঠাব।’
এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ফেরার কোনো সুযোগ নেই, তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যে আমরা কান দেবো না। আমরা চাই এদেশ থেকে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাস্তানি বন্ধ হোক। কিন্তু বিএনপি এসব শুনছে না, তারা আওয়ামী লীগের পতন থেকে শিক্ষা নেয়নি।’
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের গুন্ডারা বিএনপির সাথে আর্থিক লেনদেন ও পৃষ্ঠপোষকতায় ফেরার (পলায়ন) হওয়ার পাঁয়তারা করছে। এই অপচেষ্টা সফল হতে দেয়া হবে না।’
বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘বাকশাল ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে বাঁচার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছিলাম। ৫ আগস্টের পর তারা চাঁদাবাজিতে নতুনত্ব এনেছে, আর ক্ষমতায় যাওয়ার পর গুম কমিশনকেই গুম করে ফেলেছে। বিএনপি আওয়ামী লীগের মতোই সব অপকর্ম করে যাচ্ছে।’
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, ‘যারা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চাপ দিয়ে চাঁদা দাবি করে তাদের কাছে উন্নয়ন দাবি করে কোনো লাভ নেই। যারা কথায় কথায় মিথ্যা কথা বলে, যারা জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি করে তাদের সাথে কোনো আপস নেই, মুনাফিকদের সাথে আপস নেই।’
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ডা: মাহমুদা আলম মিতু এমপি বলেন, ‘সংস্কার করলে চাঁদাবাজি করা যাবে না, তাই তারা এখন সংস্কারের কথা ভুলে গেছেন। খালেদা জিয়া বলে গেছেন, আওয়ামী লীগের সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে, অথচ বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের সংবিধান আগলে রাখতে চাইছে।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, ‘বিচার ও সংস্কারকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্য তারা ফ্যাসিবাদীদের মতো উন্নয়নের ধুঁয়ো তুলছে।’
আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান, ঢাকা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নাল আবেদীন, বরিশাল জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবদুল জব্বার, বিএম কলেজের সাবেক এজিএস শেখ নেয়ামুল করিম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এবং বরিশাল অঞ্চল জামায়াতের টিম সদস্য ফখরুদ্দিন খান রাজী।
সমাবেশ শুরুর আগে সকাল থেকেই বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশ স্থলে হাজির হন।
দুপুরের আগেই সমাবেশস্থল কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সকাল ১০টা থেকে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে উদ্দীপনামূলক কোরাস সংগীত পরিবেশন করেন দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ বরিশাল অঞ্চলের আওতাধীন ৬ জেলা ও মহানগর শাখার শিল্পীরা।



