কোমলপানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কোকা-কোলার মিউজিক প্ল্যাটফর্ম কোক স্টুডিও বাংলার বাণিজ্যিক শ্যুটিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বড় সরদারবাড়ি। এতে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ তোলেন সংগঠনটির সদস্যরা।
একইসাথে তারা লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, কারুশিল্পীদের বঞ্চনা ও দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। এসব অভিযোগ তদন্তে বিচারবিভাগীয় কিংবা তার সমপর্যায়ের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানায় তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহ সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মোয়াজ্জেনুল হক।
শাহেদ কায়েস বলেন, ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সোনারগাঁয়ে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশনের ভেতর দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা বড় সরদার বাড়ির সংস্কার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে, যা শেষ হয় ২০১৭ সালে। পরের বছর ভবনটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। সম্প্রতি চার দিনের জন্য কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪-এর ভিডিও ধারণ ও কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন তৈরির কাজে ঐতিহাসিক ভবনটি ব্যবহার করা হয়। এ সময় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে ভবনটির ক্ষতি হয়েছে।’
শ্যুটিংয়ের পর ভবনের দেয়াল, অলঙ্করণ ও নকশার বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি এবং দ্বিতীয় আঙিনার কাছে একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘বড় সরদারবাড়ি একটি প্রত্নসম্পদ। এখানে কোনো সাধারণ শ্যুটিং লোকেশন হতে পারে না। কেননা শত শত বছরের পুরোনো স্থাপনার চুন-সুরকি, ইট, কাঠ, প্লাস্টার, মেঝে ও অলঙ্করণ অত্যন্ত সংবেদনশীল।’
এমন একটি স্থাপনায় শ্যুটিংয়ের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কিনা এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় মতামত ও অনুমোদন নেয়া হয়েছিল কিনা তাও জানতে চান সংগঠনের সদস্যরা।
এমনকি, শ্যুটিংয়ের অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন ও ভবনের শ্যুটিং-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থার নথিও প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
রফিউর রাব্বি বলেন, ‘৩০০ বছর এই সোনারগাঁ বাংলার রাজধানী ছিল। সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো খুবই গুরুতর। এই ফাউন্ডেশনে যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদের বেশির ভাগ আমলা ও অসৎ ব্যক্তি। এই পরিচালকরা ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ঐতিহ্যবাহী বড় সরদারবাড়ি কোকস্টুডিও’র মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়ার বিষয়টিতে আমরা আশ্চর্য হয়েছি। এখানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বটা আসলে কি তা আমরা জানতে চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দ, ফাউন্ডেশনের সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয় ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো: সাখাওয়াত হোসেন ও গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়নের বিরুদ্ধে।
একইসাথে সরদারবাড়ি মেরামতের নামে ভুয়া বিল তৈরি, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিপুল অর্থ ব্যয়, আবাসিক এলাকায় কুরবানি শেড ও এটিএম বুথের শেড নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়ম দুর্নীতি অভিযোগ তোলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এসব আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতে অনিয়মের তদন্তসহ ১২ দফা দাবি তুলে ধরে শাহেদ কায়েস বলেন, ‘এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃত কারুশিল্পী ও জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্য। বড় সরদারবাড়ির ক্ষতি হলে তা পুনরায় নির্মাণ করে শত শত বছরের ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। একইভাবে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত রেখে দেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন।’
অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়তিদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া ও সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের দাবিও তোলেন তিনি।
তবে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলমের দু’টি ফোন নম্বরে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। একটি নম্বর থেকে খুদেবার্তা পাঠিয়ে তিনি পরে কল করবেন বলে জানান।



