জুলাই শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো: মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগমসহ পরিবারের সদস্য এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই এই হত্যা মামলার রায় আদালতে দ্রুত কার্যকর হতে দেখতে চান।
তারা বর্তমান সরকার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রতি তাদের দৃঢ আস্থা প্রকাশ করেছেন যে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং রায়গুলো বাস্তবায়িত হবে।
সারাদেশে ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন এবং তার বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপিত হওয়ার সময়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা এই আশা প্রকাশ করেন।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তারা বলেন, আবু সাঈদকে হারানোর পর পরিবারের সদস্যদের মনে কোনো শান্তি ও সুখ নেই।
বিচার শেষে আবু সাঈদের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষের মনে শান্তি আসতে পারে।
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বাবানপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আবু সাঈদ ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন। তার তিন বোন রয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, শহরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিআরইউআর) ১ নম্বর গেটের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম ছাত্র সমন্বয়কারী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
তার শাহাদাত তাৎক্ষণিকভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে এবং এটিকে দেশব্যাপী ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করে, যা তীব্র জনরোষের মুখে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আইসিটি’র রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে তার বাবা মো: মকবুল হোসেন বলেন, ‘তার প্রিয় পুত্র আবু সাঈদ পুরো পরিবার ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের জন্য আশার আলো ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদের শাহাদাতের দুই বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। আবু সাঈদকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার ও আমার পরিবারের জন্য এখনো খুব কঠিন। পুলিশের গুলিতে আমার পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।’
ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মৃত্যুর আগে আমি আমার ছেলের হত্যাকারী এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের অন্য সব শহীদদের হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখতে চাই।’
আবু সাঈদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আইসিটি’র রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তার বাবা, ভাই, বোনসহ পরিবারের সদস্যরা এবং তিনি নিজে আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছেন না।
তিনি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আদালতের রায় কার্যকর এবং জুলাই শহীদদের অন্য সব হত্যা মামলার বিচার বর্তমান সরকার শিগগিরই সম্পন্ন করবে।’
আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন তার ভাইয়ের হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং অন্যান্য সব জুলাই শহীদদের হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, আমার ভাই আবু সাঈদ আমাদের বাড়ির উঠোনে চিরনিদ্রায় শায়িত। যখনই ভাইয়ের কবর দেখি, আমার চোখে পানি চলে আসে।
এই কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেন, আমার পরিবারের সদস্যদের মতো আমিও আশা করি যে বর্তমান সরকার দ্রুত আবু সাঈদ হত্যা মামলার আইসিটির রায় কার্যকর করবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যান্য সব শহীদ হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করে তাদের আত্মীয়দের জ্বলন্ত হৃদয়কে শান্ত করবে।
বিআরইউআর-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক ছাত্র সমন্বয়ক মো: রহমত আলী বলেন, ‘আমরা আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ন্যায়বিচার এবং এই হত্যা মামলায় আইসিটি রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।’
আবু সাঈদের সহযোগী ছাত্র সমন্বয়কারী এবং বিআরইউআর-এর বাংলা বিভাগের ছাত্র শামসুর রহমান সুমন বলেন, আবু সাঈদকে হত্যার দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বুলেটের সামনে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের দৃশ্যটি জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আইসিটি প্রায় চার মাস আগে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে। আমরা আশা করি, খুব শিগগিরই আইসিটির রায় কার্যকরের মাধ্যমে জুলাই হত্যাকাণ্ড মামলার বিচারকার্যের মাইলফলকটি চিহ্নিত হবে।’
যেহেতু বর্তমান সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই শামসুর রহমান দৃঢভাবে বিশ্বাস করেন যে বর্তমান সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের অন্য সব শহীদের বিচার সম্পন্ন করা এবং আদালতের রায় কার্যকর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
কেবল তখনই আমার শহীদ ভাই আবু সাঈদ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদের আত্মা শান্তি পাবে, যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং সেদিনটি হবে জাতির জন্য প্রকৃত আনন্দের দিন।
শামসুর রহমান বলেন, ‘কেবলমাত্র ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই আমার শহীদ ভাই আবু সাঈদ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদের আত্মা শান্তি পাবে এবং সেদিনটি হবে জাতির জন্য প্রকৃত আনন্দের দিন।’
সূত্র : বাসস



