তিন মাস পর মায়ের কোলে ফিরল নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস চ্যাম্পিয়ন রংপুর বিভাগীয় বালিকা ফুটবল দলের স্ট্রাইকার স্মৃতি কিসকু। মাকে কাছে পেয়ে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন কিসকু।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন রংপুর বালিকা ফুটবল দলের স্ট্রাইকার স্মৃতি কিসকুর মা মাতি মাই হেমরন নিখোঁজ ছিলেন প্রায় তিন মাস। ২৭ জুলাই ফাইনাল খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে স্মৃতি কিসকু সাক্ষাৎকারে জানান, তিন মাস ধরে মায়ের সাথে কথা বলতে পারছেন না। কারণ মায়ের মোবাইলফোন বন্ধ। কোথায় আছেন তাও জানেন না।
বিষয়টি নজরে নেয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। পরে তার মা মিতি মাই হেমরন গাজীপুরের বাইপাস এলাকার একটি বাড়িতে আছে বলে তথ্য পায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ওই বাড়িতে কাজের বুয়া হিসেবে কাজ করতেন মিতি মাই হেমরন।
পরে শুক্রবার (৩১ জুলাই) তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে। সেখানে হেমরনকে ফোন ও ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় বাড়ি করে দেয়া এবং চাকরির। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় এক মাসের মধ্যে কিসকুকে ইয়ুথ ক্লাবে প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার। এরপর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তাকে পাঠায় রংপুরে মেয়ের কাছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে হাতে ফোন আর ফুটবলের ব্যাগ নিয়ে পালিচড়া স্টেডিয়ামের সামনে রিকশা থেকে নামেন কিসকুর মা। ফোনের আলাপনের সুবাদে মাকে বরণ করতে আগে থেকেই তৈরি ছিলেন কিসকু।
স্টেডিয়ামের সরু গেট দিয়ে ঢোকা মাত্রই বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাওয়া বাসি গাদা ফুলের মালা দিয়েই মাকে বরণ করেন কিসকু। খানিকক্ষণ মাকে জড়িয়ে থাকেন। দু’জনের চোখেই তখন অশ্রু, কখনো হাসির ঝিলিক।
এরপর মাকে অন্যান্য খেলোয়ার ও কোচসহ নিয়ে যান প্যাভিলয়নের অস্থায়ী বাসস্থানে। সেখানে মেতে ওঠেন তৃপ্তির খুনসুটিতে। মা হেমরন ক্রীড়া মন্ত্রীর দেয়া ফোন তুলে দেন মেয়ের হাতে। খুশির ঝিলিক তখন দু’জনের মাঝে। মিষ্টি মুখেও মাতেন মা-মেয়ে, সাথে অন্যরাও। জানান আনন্দ-বেদনার অনুভূতি।
মাকে কাছে পেয়ে স্মৃতি কিসকু বলেন, ‘তিন মাস পর আমার মায়ের সাথে দেখা হলো। অনেক ভালো লাগতেছে যে মায়ের সাথে দেখা হইছে। অনেক ভালো যে মায়ের সাথে দেখা করতে পারছি তিন মাস পর। এতদিন তো ভালো লাগেনি। চ্যাম্পিয়ন হয়েও ভালো লাগে নাই আমার। মা নাই দেখে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন মা আছে অনেক ভালো লাগতেছে। মাকে জড়িয়ে ধরে অনেক ভালো লাগছে। আমি যে চ্যাম্পিয়ন হইছি, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও অতো ভালো লাগে নাই। যেটা এখন মাকে পেয়ে হচ্ছে। আমাদের টিমের সাথে যে আমি আনন্দ করব ওইটাও করতে পারি নাই ভালো করে। তো এই যে মাকে পাইছি, অনেক ভালো লাগতেছে এখন।’
স্মৃতি কিসকুর মা মিতি মাই হেমরন বলেন, ‘গ্রামে আমার কোনো কাজ ছিল না। গাজীপুর বাইপাসে গিয়ে একটি বাসায় বুয়ার কাজ শুরু করি। সেখানে যাওয়ার পর আমার ফোন নষ্ট হয়ে যায়, সেজন্য মেয়ের সাথে কথা বলতে পারিনি। আমারও অনেক কষ্ট হয়েছে, মেয়েরও কষ্ট হয়েছে। আমিও ওখানে অনেক কান্নাকাটি করেছি। তিন মাস পর আমার মেয়ের সাথে দেখা হলো। দেখা হওয়ার পরে আমার মন ভরে গেল। সবাই দোয়া করবেন, আশীর্বাদ করবেন। আমার মেয়ে আরো বড় হোক, বড় খেলোয়াড় হোক এইটুকু।’
এরপর মায়ের বহন করে আনা ক্রীড়া অধিদফতরের দেয়া ফুটবল পেয়ে আরো খুশি হয় কিসকু। মেতে ওঠেন নতুন ফোনে সেলফি খেলায়। কখনো মায়ের সাথে, কখনো সতীর্থদের সাথে।
কিসকু আরো বলেন, ‘আমি আমার মাকে আর কোথাও যেতে দেবো না। আমার অনুমতি ছাড়া আর মা কোথাও যাবে না। কারণ আমি ভালো খেলব। আমাকে ভালো খেলতে হবে। সেজন্য আমার মাকে আমার পাশে থাকতে হবে। আমি ফাইনালে খেলছি। যে গোল দিছি সেটা কেলির (ইংরেজ পেশাদার নারী ফুটবলার) মতন করে দিছি। সেজন্য আমি কেলিকে সাপোর্ট করি। ওর মতন তো গোল দিছি। ওর মতন খেলতে চাই আমি। সেকারণে মাকে আমার পাশে লাগবে।’
স্মৃতি কিসকুর মা মাতি মাই হেমরন বলেন, ‘মন্ত্রী বলেছেন আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে ঢাকায়। আমি তাতে খুশি। ওখানে যদি আমাকে একটা চাকরি দেয়। তাহলে মেয়েটা আমার কাছে থাকতে পারবে। আর গ্রামের বাড়িটা যদি বানায়ে দেয় তাহলে ঢাকা থেকে এসে এখানে থাকতে পারব। আমার আর একটা চাওয়া সেটা হলো ফুটবল খেলায় অনেক ভালো খাবার খেতে হয়। সেটার সাধ্য আমার নাই। সরকার যদি মেন্যু অনুযায়ী খাবার টা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে দিতো। তাহলে আমার মেয়ের স্বপ্নটা পূরণ হতো। ও দেশটাতে বিশ্বের কাছে বড় করতো।’
এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্মৃতি কিসকুর প্রধান কোচ মিলন মিয়া। তিনি জানান, কিসকু আজ তার মাকে ফিরে পেল। এর অবদান যমুনা টেলিভিশনের। তারাই প্রথম কিসকুর মা যে নিখোঁজ সেটা প্রচার করেছে। আমিও জানতাম না। কারণ ও আমাদের বুঝতেই দেইনি যে, ওর মায়ের সাথে তিন মাস ধরে কথা বলতো না। ও শুধু খেলাটাকে ভালোবাসে। খেলার সময় বাবা হারানো, মা নিখোঁজ বিষয়টি মাথাতেই আনেনি। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সেটা বোঝা গেছিল।
তিনি আরো জানান, মাকে পেয়ে সে খুশি। তার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা। ক্রীড়া অধিদফতর থেকে আমাকে বলেছে তৈরি রাখতে, আগামী মাসে ইয়ুথ ক্লাবে খেলার জন্য নিয়ে যাবে। ওর মধ্যে দারুণ সম্ভাবনা আছে। ওকে যদি নার্সিং করা যায় তাহলে একদিন সে বাংলাদেশকে অনেক এগিয়ে নেবে নারী ফুটবলে।
রংপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) জানান, রংপুর বিভাগীয় দল এবার খুবই ভালো করেছে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে। সেই কারণে আমরা চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপসহ বিভিন্ন ইভেন্টে বিজয়ীদের ১৭ তারিখ সংবর্ধনা দেবো। খেলোয়াড়দের জন্য যা যা করা দরকার করব।
রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, আমরা পালিচড়া স্টেডিয়ামে ৬ তারিখে খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দেবো। এর মাধ্যমে আমরা তাদের উৎসাহিত করতে চাই। কারণ তারা আমাদের রংপুরকে বাংলাদেশের মধ্যে নাম কামিয়ে এনে দিয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, খেলার পরের দিনই আমরা বিভাগের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দিয়েছি। তাদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ফাইনালে জোড়া গোল এসেছিল কিসকুর পা থেকে। মোট চারটি গোল করেছিল পুরো ম্যাচে।



