নওগাঁয় ফিরছে সৌদি অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৩ প্রবাসীর কফিন

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রযুক্তি অগ্নিকাণ্ডে ১৩ প্রবাসী
প্রযুক্তি অগ্নিকাণ্ডে ১৩ প্রবাসী |নয়া দিগন্ত

সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ প্রবাসী নিহত হয়েছেন। রোববারের ওই ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। স্বপ্ন পূরণের আশায় প্রবাসে যাওয়া এসব মানুষের লাশ এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায়। নিহতদের বাড়িতে চলছে শোক ও আহাজারি।

রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।

এই ঘটনায় একসাথে ১৩টি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন শুধু কান্না আর আহাজারি। যে বাড়িগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে সংসারে স্বস্তি ফিরেছিল, সেসব বাড়িতেই এখন শোকের মাতম।

নিহতদের মধ্যে একই গ্রামের চারজন। তারা হলেন আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুাল্লহ প্রামাণিক (৩৫)।

এছাড়া উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮) নিহত হয়েছেন।

দুই ভাইকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

গন্ডগোহালী গ্রামে মোহন ও সুমনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন মা ময়না খাতুন। প্রিয় সন্তানদের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বড় ছেলে সাত বছর ধরে সৌদিতে ছিলেন, আর মেজো ছেলে গেছেন দুই বছর। কোনোদিনই ছুটিতে আসেননি। ছেলে বলেছিলেন, কষ্ট করে খেয়ে ঋণ শোধ করছেন। বাড়ির কাজ শুরু করেছেন, ফিরে এসে বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ করবেন। বাড়ি এসে বিয়ে করবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হলো না।

ঘরে ফেরার কথা বলে যাওয়া দুই ছেলের বদলে এখন ফিরবে তাদের নিথর দেহ।

নাতনির মুখ দেখার ১৪ দিনের মাথায় শোক

একই গ্রামের নিহত রুবেল প্রামাণিকের বাড়িতেও কান্নার রোল। মাত্র ১৪ দিন আগে নাতনির মুখ দেখেছিলেন বাবা মোহাম্মদ সাইদুর। তখন কে জানত, সেই আনন্দের পরই নেমে আসবে এমন নির্মম শোক।

সাইদুর বলেন, রুবেলের সৌদি যাওয়ার বয়স নয় বছর। সাড়ে ছয় বছর পর ছুটিতে এসে বিয়ে করেন। এরপর আবার সৌদি চলে যান। সেখানে যাওয়ার পর দুই বছর আগে সন্তান জন্ম নেয়। ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে আবার সৌদি গিয়েছিলেন। সেখানে সোফা তৈরির কাজ করতেন তিনি।

কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, তার আর দুনিয়ার বুকে কেউ রইল না। নাতনি হয়েছে মাত্র ১৪ দিন। সেই নবজাতককে রেখে ছেলেকে চলে যেতে হলো।

ঋণের বোঝা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফরিদের পরিবার

উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দেড় বছর আগে পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। ফরিদের পাঠানো অর্থেই চলছিল সংসার এবং ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন দেখছিল পরিবার।

ফরিদের বাবা ময়েন শেখ বলেন, ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে তারা অনেক ঋণের মধ্যে পড়েছেন। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করবেন কিভাবে এবং সংসারই বা চালাবেন কিভাবে—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে তাদের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগার অভিযোগ

ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আগুনের সময় কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন।

তার দাবি, কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগায় শ্রমিকেরা বের হতে না পেরে মারা যান।

তিনি বলেন, ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকতেন এবং রাতে কাজ করতেন। আগুন লাগার সময় সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন।

হাসিবুল ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে এবং জীবিকার তাগিদে তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান।

স্বজনদের অভিযোগ, পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে যাওয়া সেই তরুণই শেষ পর্যন্ত ফিরছেন লাশ হয়ে।

নওগাঁর গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ বিভিন্ন গ্রামে এখন প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা। তবে সেই অপেক্ষায় নেই কোনো আনন্দ, নেই বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। অপেক্ষা শুধু কফিনবন্দী আপনজনের।

স্বজনদের কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয় মানুষের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কান্না দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোর চোখও ভিজে উঠছে। শোকের ভারে অনেক বাড়িতেই যেন থমকে গেছে সময়।

নিহতদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। লাশ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে দেশে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দেশে ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।