সুন্দরবনের উপকূলে লবনাক্ত মাটিতে আঙ্গুর চাষের সম্ভাবনা

সুন্দরবন উপকূলীয় লবণাক্ততা আর বছরজুড়ে আবহাওয়ার নানা প্রতিকূলতার মাঝে পাইকগাছায় চ্যালেঞ্জিং কৃষিতে আঙ্গুরের চাষ স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন উদ্যোক্তাদের।

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা)

Location :

Paikgachha
সুন্দরবনের উপকূলে লবনাক্ত মাটিতে আঙ্গুর চাষের সম্ভাবনা
সুন্দরবনের উপকূলে লবনাক্ত মাটিতে আঙ্গুর চাষের সম্ভাবনা |নয়া দিগন্ত

সুন্দরবন উপকূলীয় লবণাক্ততা আর বছরজুড়ে আবহাওয়ার নানা প্রতিকূলতার মাঝে পাইকগাছায় চ্যালেঞ্জিং কৃষিতে আঙ্গুরের চাষ স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন উদ্যোক্তাদের।

প্রথমে পরীক্ষামূলক ও পরে বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষে সফল চাষী উপজেলার কপিলমুনির বিরাশি গ্রামের তৈয়েবুর রহমান আশা। কৃষি ও কৃষি উদ্যোক্তাদের তিনি রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

পাইকগাছার কৃষিতে প্রতি বছর নতুন নতুন সফল উদ্যোগ যেমন তরমুজ, মাল্টা, স্কোয়াশ, বার্লি এরপর তৈয়েবুরের আঙ্গুরের আবাদ উপকূলের সম্ভাবনাময় কৃষিতে নতুন পালক যোগ করেছে। তার ব্যতিক্রমী আঙ্গুর চাষে ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার খোরাক জুগিয়েছে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, আঙ্গুরের জন্য অনুপযোগী অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় এর আবাদ সফলতার মুখ দেখেছে। স্বল্প জমিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মাধ্যমে লাভবান হওয়া সম্ভব, তৈয়েবুর রহমান তার বাস্তব উদাহরণ। মাত্র তিন শতক জমিতে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে তিনি আঙ্গুর চাষ করছেন যা, উপকূলীয় কৃষিতে একেবারেই নতুন ও সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর তৈয়েবুর পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র দু’টি আঙ্গুর গাছ রোপণ করেন। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন হওয়ায় চলতি বছর তিনি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। প্রায় আট মাস আগে আরো ২০টি জিও ব্যাগে আঙ্গুর গাছ লাগান তিনি। বর্তমানে প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় আঙ্গুর ধরেছে, যার প্রতিটি থোকার ওজন প্রায় এক কেজি বা তারও বেশি। প্রতিটি গাছে ফলের পরিমাণ ও মান দেখে স্থানীয়দের পাশাপাশি কৃষি সংশ্লিষ্টরাও রীতিমত বিস্মিত ও আগ্রহী।

কৃষক তৈয়েবুর জানান, মূলত জিও ব্যাগে চাষ করার ফলে গাছের শিকড় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং প্রয়োজনানুযায়ী মাটি, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠভাবে করা যায়। এতে লবণাক্ত মাটির ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়। এছাড়া মাচা পদ্ধতিতে গাছগুলো উপরের দিকে ছড়িয়ে দেয়ায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়, ফলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দু’টোই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তৈয়েবুর আরো জানান, কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি নতুন কিছু করার চিন্তা করেন। অনলাইন, ইউটিউব ও বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক ওয়েবসাইট দেখে আঙ্গুর চাষের ধারণা নেন। এরপর সাহস করে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন।

প্রথমে উপকূলীয় এলাকায় আঙ্গুরের সফলতা নিয়ে নিজেরও সংশয় ছিল জানিয়ে তিনি জানান, প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, সঠিক পদ্ধতির আবাদ তাকে সফলতা এনে দিয়েছে। এরআগে উপজেলায় প্রথমবারের মত স্কোয়াশ চাষ করে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষকের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। এখন আঙ্গুর চাষে সফলতা তাকে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করতে বড় ধরনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

আঙ্গুর চাষে আগ্রহীদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন তিনি। এলাকায় এ ব্যাতিক্রমী চাষ ছড়িয়ে পড়লে কৃষকরা নতুনভাবে লাভবান হতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের আরেক কৃষক তহিদুল ইসলামও আঙ্গুর চাষে সফল হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে তিনটি ভিন্ন জাতের আঙ্গুর চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছেন বলে জানানো হয়েছে। তার বাগানেও প্রতিনিয়ত স্থানীয় কৃষকরা পরিদর্শনে যাচ্ছেন এবং নতুনভাবে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: একরামুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় আঙ্গুর চাষ একটি ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সাধারণত এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আঙ্গুরের জন্য অনুকূল নয় বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সে ধারণা বদলে দিচ্ছেন তৈয়েবুর রহমান ও তহিদুল ইসলামরা।’

তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা উন্মুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরো বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।’

স্থানীয়দের অভিমত, এ ধরনের উদ্ভাবনী কৃষি উপকূলীয় অঞ্চলের চ্যালেঞ্জিং কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। শুধু আঙ্গুর নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল চাষের পথও সুগম হবে। এতে কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষকদের আয় বৃদ্ধি তথা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ারও নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন উপকূলীয় কৃষি হুমকির মুখে, তখন এমন উদ্যোগই হতে পারে টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। আর সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন ও ব্যতিক্রমী স্বপ্নবাজ তৈয়েবুর রহমানরা। নতুনদের হাত ধরে এগিয়ে যাক উপকূলের কৃষি এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দেরও।