ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগে বন্যার আশঙ্কা, প্লাবিত হাওরাঞ্চল

চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে জেলার মনু ও জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, সারি-গোয়াইনসহ বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের চার জেলা—সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং কোথাও কোথাও পাকা বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে জেলার মনু ও জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। একই সঙ্গে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, সারি-গোয়াইনসহ বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার কুলাউড়া, জুড়ি ও বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মৌলভীবাজারে সর্বোচ্চ ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে শেরপুরে ১৮০ মিলিমিটার এবং শ্রীমঙ্গলে ১৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া কুলাউড়ায় ১৩৫ মিলিমিটার, কমলগঞ্জে ১০৬ মিলিমিটার, বড়লেখার দক্ষিণভাগে ১০৪ মিলিমিটার ও লাতুতে ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জেও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার, তাহিরপুরে ১৩৩ মিলিমিটার, সিলেটে ১২৭.২ মিলিমিটার এবং হবিগঞ্জে ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিলেটে গত ৭২ ঘণ্টায় প্রায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের চাপে ঝিনারিয়া হাওরের একটি সড়ক ভেঙে গেছে। এতে আশপাশের বোরো ধানখেত প্লাবিত হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ওই এলাকায় প্রায় ২৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধান ছিল, যার মধ্যে ১৫ হেক্টরের ধান কাটা হলেও অবশিষ্ট জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, কষ্ট করে উৎপাদিত ফসল পানিতে ডুবে যাওয়ায় তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে একটি সড়ক ভেঙে গেছে, যা স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, এটি তাদের প্রকল্পভুক্ত কোনো বাঁধ নয়।

এদিকে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা সৃষ্টি হওয়ায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। মৌসুমি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকায় আর্দ্র বাতাসের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৃষ্টিপাতের প্রধান কারণ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিলেট অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে, যার গতি ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, আগামী ৫ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নেত্রকোণার ভুগাই-কংশ, সোমেশ্বরী ও মগরা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে মৌলভীবাজারের মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, মৌলভীবাজারে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলাতেও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।